সকল মেনু

‘আস্থা’ ফেরানোর দ্বন্দ্বে বিএসইসি চেয়ারম্যান

সিনিয়র রিপোর্টার: পুঁজিবাজারে বারবার যে আস্থার সংকটের কথা বলা হয়, সেটি দূর না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। বলেছেন, এই আস্থা কোত্থেকে আনবেন, সেটি বুঝতে পারছেন না।

পুঁজিবাজার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব দাবি পূরণ হয়ে যাওয়ার পরও বাজার গতিশীল না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এমন মন্তব্য এলো তার পক্ষ থেকে। সোমবার বিএসইসি কমিশনের হল রুমে ‘বিশ্ব বিনিয়োগ সপ্তাহ-২০২২’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখছিলেন শিবলী রুবাইয়াত।

শিবলী রুবাইয়াত এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের শুনতে শুনতে কান ব্যাথা হয়ে গেছে। আস্থা, এই আস্থা যে কোথা থেকে আনব সেটা আমরা বুঝি না।

পুঁজিবাজার এই অবস্থায় থাকবে না, এটাও বিশ্বাস করেন তিনি। বলেন, আমরা মনে করি আমাদের ১৯৯৬ বা ২০১০ আর ব্যাক করবে না। আমাদের অনেক মানুষ সাহায্য করছে আমরা পুরোনো স্মৃতিগুলো ভুলে যাচ্ছি। আমরা নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করি। আমাদের জন্য ভালো সময় অপেক্ষা করছে। আমাদের সবচেয়ে আস্থার জায়গা প্রধানমন্ত্রী।

পুঁজিবাজার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করলে অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে গোটা দেশই উপকৃত হবে বলে মনে বিএসইসি চেয়ারম্যান। বলেন, আমরা ভালো ব্যবসা করলে এনবিআর বেশি কর পায়, ব্রোকারেজ হাউজ ভালো ব্যবসা করলে, মার্চেন্ট ব্যাংক ভালো ব্যবসা করলে সেই টাকা দেশের উন্নয়নে লাগে। আমরা সবাই মিলে দেশের কাজ করছি।

এই অনুষ্ঠানেও বিষয়টি উঠে আসে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ বলেন, ‌‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

গভর্নর ও নজিবুরকে নিয়ে উচ্ছ্বাস 

একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। তিনি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, এই বাজারের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।

গত তিন মেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের মুখ থেকে এই ধরনের পরামর্শ কখনও আসেনি।

বিএসইসি চেয়ারম্যান নতুন গভর্নরের পুঁজিবাজারবান্ধব মনোভাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বলব, বাংলাদেশ খুব সৌভাগ্যবান যে এমন একজন গভর্নর আমরা পেয়েছি, যিনি ফাইন্যান্স সচিব ছিলেন আর সারাজীবন এগুলো নিয়েই কাজ করেছেন, যা আমাদের দেশের কাজে লাগছে।’

আস্থা কোথা থেকে আনব জানি না: বিএসইসি চেয়ারম্যান
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও, যার সহযোগিতায় পুঁজিবাজার অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদী বিএসইসি চেয়ারম্যান

শিবলী রুবাইয়াত পুঁজিবাজারে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মূখ্য সচিবকে নজিবুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন, যাকে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নজিবুর রহমান একটি ডাইনামিক এবং ভাইব্রেন্ট এনবিআর করতে ভূমিকা রেখেছেন। করোনার মধ্যে যখন পুঁজিবাজার সংকটের মধ্যে পড়ে তখন অনেক টাকা দরকার পড়ে। তখন ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড গঠন করে পুঁজিবাজারকে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘সিএমএসএফ আসার পরই ২০ বছরের পুরোনো চারটি ডিবেঞ্চার এবং দুটি বন্ড কূপন পেমেন্টের মাধ্যমে বাকি ছিল, তা দিতে বাধ্য হয়েছে এবং সব টাকা আদায় করেছে। এই মুহূর্তে আর কারও বন্ড বা ডিবেঞ্চারের পেমেন্ট আনক্লেইমড নাই।

অনুষ্ঠান কক্ষে আসার পর নজিবুর রহমানের সঙ্গে তার আলাপচারিতাও তুলে ধরেন শিবলী রুবাইয়াত। বলেন, আমি ঢুকতে ঢুকতে আমি ওনার সামনে যাওয়া আগেই তিনি বলে উঠলেন, ‘কি মার্কেট এত উঠানামা করে কেন?’ আমি তো হেসে দিছি, ‘আমি কী বলব ওনাকে? আমি বলেছি একটু উঠানামা তো করবেই।’ বললেন, ‘দেইখো বেশি যাতে কারও ক্ষতি না হয়।’ তার মানে প্রতিদিন তিনি খবরের কাগজ পরেন।

বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে আরও কিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ড আসবে বলেও জানান বিএসইসি প্রধান। বলেন, ‘ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে বিনিয়োগকারীদের না দেয়ার যে প্রবণতাটা ছিল, তা অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর যদি কেউ না দেয় তাহলে সেটা সিএমএসএফ নিয়ে যাবে।’

মৃত্যুর ২৮ বছর পর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পাওনা টাকা দেয়ার বিষয় উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কয়েকদিন আগে শহীদ জননীর পাওনা টাকা সিএমএসএফের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কিন্তু মানুষ একটা বিষয় পরিষ্কার বার্তা পেয়েছে যে, পুঁজিবাজারে আর কারও টাকা না পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারও ন্যায্য পাওনা না দিলে যে কেউ না কেউ আদায় করবে তা পরিষ্কার।

ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর তাগিদ

পুঁজিবাজার নিয়ে ব্যাংক খাতের মনোভাব সহযোগিতামূলক হওয়া উচিত বলেও মনে করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। বলেন, ‘ব্যাংকিং সেক্টর যেন মনে না করে ক্যাপিটাল মার্কেট রিচ হলে মানি মার্কেটের কখনোই ক্ষতি হবে। তা কখনোই হবে না।

‘গভর্নর নিজেই বলেছেন, আপনারা যা-ই করেন টাকা তো আমার কাছেই রাখতে হবে। তারমানে ব্যাংকিং সেক্টর আর ক্যাপিটাল মার্কেট এক।’

শিবলী রুবাইয়াত বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেটে যা ব্যবসা হয় ঘুরেফিরে ব্যাংকের কাছেই থাকে। তাই কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের কোনো অসুবিধাই হবে না। আর আমাদের কোথাও টাকা রাখার জায়গা নেই। আমরা দিনশেষে ঘুরেফিরে রউফ তালুকদার সাহেবের (গভর্নর) কাছেই যাব। যা নেব ওনার কাছ থেকেই নেব আর যা দেবো ওনাকেই দেবো। সুতরা ব্যাংকিং সেক্টর বা মানি মার্কেট যেন কখনও মনে না করে ক্যাপিটাল মার্কেট রিচ হয়ে গেলে মানি মার্কেটের আবার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসইসি কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ।

কমিশনের নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন কমিশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছায়েদুর রহমান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশসের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ডি রোজারিও এবং বাংলাদেশ অ্যাসেসিয়েশন অফ পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ এর সেক্রেটারি জেনারেল আমজাদ হোসেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top