সকল মেনু

এসআইবিএল থেকে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুষে নিল বন্ধ কোম্পানি

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠান শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিটি ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মূল্যের ৮৮৯ টি ব্যাক টু ব্যাক লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খুলেছিল। অবাক করার মতো হলেও এ সময়ের মধ্যে এলসিগুলোর একটিও রপ্তানি হয়নি।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় শার্প নিটিংয়ের কারখানা পরিদর্শন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল। কোম্পানিটি ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এলসি খুললেও আদৌ এটি কোনো পণ্যের কাঁচামাল আমদানি বা উৎপাদন করেছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পরিদর্শক দলটি।

বিশেষজ্ঞ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন; বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুল্ক ছাড় সুবিধার অধীনে পোশাক খাতের কোম্পানিটিকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা প্রদান করেছিল এসআইবিএলের বনানী শাখা। কিন্তু এর বন্ডেড ওয়্যারহাউজের কোনও বৈধ লাইসেন্স নেই, যা বিধিমালার আরেকটি গুরুতর লঙ্ঘন।

বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হলো মূলত একটি ভবন বা কোনও সুরক্ষিত এলাকা যেখানে শুল্কযোগ্য পণ্য সংরক্ষণ করা হয় অথবা শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে দুই বছর। পরবর্তীতে তা পুনরায় নবায়ন করতে হয়। কিন্তু ২০০৩ সালের পর লাইসেন্স আর নবায়ন করেনি শার্প নিটিং। বর্তমানে কোম্পানিটির কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

গুরুতর অনিয়ম : অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, কোন কোম্পানির কাছে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার বৈধ লাইসেন্স না থাকলে ব্যাংক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ইস্যু করতে পারে না। তাই এটি একটি গুরুতর অনিয়ম।

তিনি আরও বলেন, আমদানি করা কাঁচামাল দেশে এলে তাদের বিল অন এন্ট্রি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এক্ষত্রে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অর্থ পাচারের কোনো কার্যক্রম থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর দায় এড়াতে পারে না।

মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিন বলেন, একটি প্রভাবশালী মহল ঋণ প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং এই ধরনের দুরবস্থাগ্রস্ত একটি কোম্পানি কীভাবে এত বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পেরেছে তা খুঁজে বের করা।

এ বিষয়ে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) বনানী শাখার ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন বলেন, আমি সম্প্রতি এই শাখায় নিয়োগ পেয়েছি এবং আমি এখনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলম বলেন, আমরা শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি আমরা। ঋণগ্রহীতাও আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।

তিনি জানান, ২০১৫ সালে এই কোম্পানিকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা দিয়েছিলাম, কিন্তু কোম্পানিটি কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।

শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আমি এই কোম্পানিটি অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করেছি। বর্তমানে কোম্পানিটিতে কী ঘটছে সে বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই।

এসআইবিএল মিরপুর শাখায়ও অনিয়ম : আরেকটি দুরবস্থাগ্রস্ত কোম্পানি ব্লিথ ফ্যাশন লিমিটেডকে শুল্ক ছাড় সুবিধার অধীনে ৫.৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ১২৩ টি লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খুলতে দিয়েছিলো এসআইবিএল মিরপুর শাখা। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এলসিগুলো খোলা হয়।

এই কোম্পানিরও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, কোম্পানিটি ৮৪২ লাখ ৬৬৩ ডলারের বেশি মূল্যের এলসি খুললেও বিপরীতে রপ্তানি ছিল শুন্য। গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।

নাবিল গ্রুপকে ১১২০ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে এসআইবিএল

রাজশাহীভিত্তিক একটি অখ্যাত ব্যবসায়িক সংগঠন নাবিল গ্রুপকে সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রদানের জন্য কাজ করছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি।

চলতি বছরের ৩০ মে, ব্যাংকটি তার ৪৮১ তম বোর্ড সভায়- নাবিল ফিড মিলস লিমিটেড, নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেড এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলিকে মোট ১১২০ কোটি টাকা (তহবিলযুক্ত এবং নন-ফান্ডেড উভয়) ঋণ অনুমোদন করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নাবিল গ্রুপের অধীনে ব্যবসায় ঋণ অনুমোদনের জন্য নিয়মাবলী এবং শর্তাবলী শিথিল করেছে এসআইবিএল। ঋণগুলি ঝুঁকিপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এলসি কমিশন কমিয়েছে ঋণদাতা ব্যাংকটি। একইসঙ্গে ঋণ প্রদানের জন্য জামানত এবং ব্যক্তিগত গ্যারান্টিও জমা নেয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, এসআইবিএল এ গ্রাহককে কোনো ধরনের বেআইনি সুবিধা দিচ্ছে কিনা এবং কোম্পানিটি এই ব্যাংকের কোনো পরিচালকের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান কিনা তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসআইবিএলের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top