সকল মেনু

ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা

ডেস্ক রিপোর্ট: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে মুদ্রানীতিতে আমূল সংস্কার আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই দেশে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদসীমা উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় ঠেকাতে ডলার বিক্রি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হলে বাজারদরে অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

রিজার্ভের হিসাবায়নের ক্ষেত্রেও আইএমএফের বেঁধে দেয়া শর্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেক্ষেত্রে দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে। আবার রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোও বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রোববার বিকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এসব ঘোষণা দেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, চলতি অর্থবছরেই টাকার প্রায় ১৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন, রিজার্ভের অস্বাভাবিক পতনসহ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ফলে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতির বেশির ভাগ লক্ষ্যই অধরা থেকে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতি অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতি ধরে রাখতে সমর্থ হয়নি।

মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৩০ শতাংশও পেরোয়নি। বিপরীতে দেশের মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রিজার্ভ মানি, ব্রড মানির মতো মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকগুলো অর্জনের হারও অপ্রত্যাশিত।

মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমানও। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা সংকট এজন্য দায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের সাফল্যও অনেক বেশি। নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য আমরা একটি কার্যকর মুদ্রানীতি প্রণয়নের চেষ্টা করেছি।

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে দুই বছর আগে দেশের ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়। ওই সময় থেকেই সুদহার বেঁধে দেয়া নীতির সমালোচনা করে আসছে আইএমএফ। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ নীতিনির্ধারকরাও এ নীতি তুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে বাস্তবায়ন হওয়া সর্বোচ্চ সুদের নীতি থেকে এবার বের হয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডলার সংকটের কারণে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ ঋণ প্রাপ্তির অন্যতম শর্ত হলো ব্যাংকঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া। এজন্য একটি করিডোরভিত্তিক সুদহার প্রণয়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ। নতুন মুদ্রানীতিতে আইএমএফের সুপারিশের বাস্তবায়ন ঘটানো হচ্ছে।

এক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদের সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডোর দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডোর যুক্ত হল ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশের বেশি হবে।

আইএমএফের সুপারিশ মেনে রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোরও সংস্কার আনা হচ্ছে। এসব হাতিয়ার ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, কলমানির সুদহার যাতে অস্বাভাবিক বেড়ে না যায়, সে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোকে এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে অর্থের চাহিদা তীব্র হলে ব্যাংকগুলো সহজেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করতে পারবে।

২০২১-২২ অর্থবছরজুড়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতি পার করেছে বাংলাদেশ। রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানির ধাক্কায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়। ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতিও ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের আমদানি ঋণপত্রের (এলসি) লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সংকটের পাশাপাশি এলসি খোলার শর্ত কঠোর করায় আমদানির পরিমাণ ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে এসেছে।

আমদানি কমিয়েও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতার প্রভাবে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি কিছুটা কমলেও অর্থনীতির ওপর চাপ কমেনি। ঘাটতি কমেনি দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টেরও (বিওপি)। বরং অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বিওপির ঘাটতি অনেক বেশি স্ফীত হয়েছে।

এপ্রিল শেষে বিওপির ঘাটতি ৮৮০ কোটি বা ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিওপির ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের বড় ঘাটতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরো বেশি চাপে ফেলেছে। দিন যত যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও ততই ক্ষয় হচ্ছে। ১৪ জুন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। যদিও ২০২২ সালের একই দিন দেশের রিজার্ভ ৪১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল।

আমদানি দায়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য অব্যাহতভাবে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। রিজার্ভ থেকে এত পরিমাণ ডলার বিক্রি সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলোর আমদানির ঋণপত্র (এলসি) দায় পরিশোধ এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

জ্বালানি তেল, সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের এলসি দায় যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে বাকিতে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। কয়লার বিল বকেয়া পড়ায় এর আগে প্রায় এক মাসের মতো বন্ধ ছিল রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। একই কারণে চলতি মাসে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়ার পরিমাণ ২ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে বলে জানা গেছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের এলসি দায় পরিশোধে ডলার বিক্রির নীতি থেকে সরে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে দেশের আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১০৯ টাকা। কিন্তু সরকারি এলসি দায় পরিশোধের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক কম দামে ডলার বিক্রি করছে। আগামী ১ জুলাই থেকে আর কম দামে ডলার বিক্রি করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আগামী অর্থবছর থেকে কোনো ব্যাংক যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে চায়, তাহলে বাজারদর পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া রফতানি আয়, রেমিট্যান্স ও আমদানির জন্য ডলারের একক দর ঘোষণা দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

  • তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top