সকল মেনু

‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ আইএফআইসি ব্যাংকের নয়

ডেস্ক রিপোর্ট : গাজীপুরে একটি বিশাল আবাসন প্রকল্পের তহবিল সংগ্রহের জন্য চোখ ধাঁধানো রিটার্ন দিয়ে বন্ড ইস্যু করেছে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। তবে, এক হাজার কোটি টাকা তোলার জন্য বন্ডটি যেভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইএফআইসি ব্যাংক এই বন্ড ইস্যু করেনি। কারণ প্রচারণা দেখে মনে হয়েছে, একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এই বন্ড ইস্যু করেছে, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি নয়।

দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান ও তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এই রিয়েল এস্টেট কোম্পানির অংশীদার এবং ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার, তাই এখানে স্বার্থ সংঘাতের (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ বন্ডের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু, এটি ব্যাংকটির জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যে ব্যাংকের শেয়ার সালমান এফ রহমান ও তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানের চেয়ে সরকার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতেই বেশি।

গত সপ্তাহে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি পাঁচ বছর মেয়াদি আইএফআইসি আমার বন্ডের সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে, অর্থাৎ এক হাজার কোটি টাকার সব বন্ডই মাত্র এক মাসের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।

এই বন্ডের বিপরীতে বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে সুদ (এটি ডিসকাউন্ট রেট নামে পরিচিত) দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সুদের হার জাতীয় সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকে আমানতের হার ও অন্যান্য করপোরেট বন্ডে দেওয়া সুদের হারের চেয়ে বেশি।

কিন্তু বড় বিষয় হলো আইএফআইসি ব্যাংক এই বন্ড ইস্যু করেনি। মূলত রিয়েল এস্টেট কোম্পানি শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড (এসটিএল) এই বন্ডের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করেছে। যে কোম্পানিটি চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আইএফআইসি ব্যাংক এই বন্ডের গ্যারান্টি দিচ্ছে, যদিও টাউনশিপ তৈরি করা তো দূরের কথা কোনো ফ্ল্যাট নির্মাণ বা কোনো প্লট তৈরির অভিজ্ঞতাও কোম্পানিটির নেই।

উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে জিরো কুপন বন্ড ইস্যুকারী কোনো কোম্পানি কখনো কোনো ব্যাংকের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের জন্য গ্যারান্টি চায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ডেট সিকিউরিটিজ রুলস অনুসারে গ্যারান্টি নেওয়ার প্রয়োজনও হয় না। এতে কোম্পানির খরচও বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এই বন্ডকে ‘খেলাপির উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় মৌখিকভাবে এসটিএলকে গ্যারান্টার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, তিনি যদি আইএফআইসির শীর্ষ নির্বাহী হতেন, তাহলে কখনোই আমানতকারীদের অর্থ ব্যবহার করে এমন একটি কোম্পানিকে গ্যারান্টি দিতে দিতেন না।

তার মতে, এসটিএল আইএফআইসি ব্যাংকের সুনাম ব্যবহার করে টাকা তোলার গ্যারান্টি পেয়েছে এবং জনগণকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা টাকা ফেরত দিতে গিয়ে খেলাপি হবে না।

এসটিএল কি আইএফআইসির নাম ব্যবহার করতে পারে?

বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে এসটিএল তাদের বন্ডের নাম হিসেবে ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ নামটি ব্যবহার করছে। যা তাৎক্ষণিকভাবে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ধারণা দেবে যে, এ বন্ড বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক ইস্যু করেছে।

সংবাদপত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলোতে আইএফআইসির নাম বড় করে লেখা থাকলেও এসটিএলের নামটি অনেক ছোট ফন্টে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক সময় বন্ডটির আসল নাম ‘আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড’ একেবারেই উল্লেখ করা হয়নি।

সাবেক এক ব্যাংকার বলেন, এ বন্ডের নাম ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ হতে পারে না, কারণ এর মাধ্যমে ইস্যুকারীর নাম বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বন্ডের এই নাম স্পষ্টতই বিভ্রান্তিকর।’

এই ব্যাংকার আরও বলেন, ব্যাংকটি তার ব্র্যান্ড ইমেজ নতুন একটি কোম্পানিকে ব্যবহার করতে দিয়েছে। কারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ইস্যুকারীর নাম জানলে অর্থ বিনিয়োগ করতে চাইবে না। ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের প্রতারণা বিরল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যে, কীভাবে তারা এভাবে নাম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, যোগ করেন তিনি।

করপোরেট মামলা নিয়ে কাজ করা এক আইনজীবী বলেন, বন্ডের নাম এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে তাতে বন্ডের আসল নাম এবং প্রকৃত ইস্যুকারীর নাম ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বন্ডের নামের মধ্যে ‘আমার’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করাও ভুল তথ্যের আরেকটি উদাহরণ, কারণ এটি মূল নামের কোনো অংশ নয়।

এভাবে ভিন্ন নাম ব্যবহার অনেককে বিভ্রান্ত করেছে।

পত্রিকায় বেশ কিছু বিজ্ঞাপন দেখে বন্ড কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রাজু আহমেদ। তিনি ভেবেছিলেন, আইএফআইসি উচ্চ সুদ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছে।

রাজু আহমেদের মতো অন্তত ১০ জন বিনিয়োগকারী একই কথা বলেছেন। কিন্তু, টাকা উত্তোলনের এই কৌশল জানার পর তাদের কেউই শেষ পর্যন্ত বন্ড কেনেননি।

স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট)

বন্ডের নথিতে দেখা যায়, এসটিএলের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির ভিত্তিতে বেক্সিমকো লিমিটেড ও এসএফআর রিয়েল এস্টেট লিমিটেড সম্মিলিতভাবে এসটিএলকে ২৫ একর জমি দিয়ে অংশিদারীত্ব তৈরি করেছে।

অন্যদিকে এসটিএল পরিকল্পনা করছে টাউনশিপের কাজের জন্য কেনাকাটা ও নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে নিয়োগ দেওয়া হবে। বেক্সিমকো লিমিটেডের মালিকদের মধ্যে সালমান এফ রহমান ও তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান যথাক্রমে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস-চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা।

দুজনেই আবার আইএফআইসি ব্যাংকের বোর্ডে আছেন। সালমান এফ রহমান ব্যাংকটির চেয়ারম্যান এবং শায়ান ফজলুর রহমান ভাইস চেয়ারম্যান। তবে, এসএফআর রিয়েল এস্টেট নিয়ে কোনো তথ্য পাবলিকলি পাওয়া যায়নি।

এটি শেষ পর্যন্ত এই ইঙ্গিত দেয় যে, আইএফআইসি তার দুই পরিচালকের ব্যবসার সুবিধার জন্য প্রকল্পটিকে গ্যারান্টি দিচ্ছে ও ঝুঁকি নিচ্ছে। কারণ এসটিএল এই অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে ব্যাংকটিকে সুদসহ অর্থ ফেরত দিতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আইএফআইসি ব্যাংকে মালিকদের মাত্র ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, সরকারের ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও রিটেইল শেয়ারহোল্ডারদের ৩৯ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার আছে।

এসব তথ্য জানা সত্ত্বেও বিএসইসি বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে।

একজন শীর্ষ ব্যাংকার এটিকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) হিসেবে দেখছেন, কারণ ব্যাংক গ্যারান্টিটি এমন একটি কোম্পানিকে দেওয়া যেখানে তার পরিচালকদের কোম্পানির অংশীদারিত্ব আছে।

তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ব্যাংকটি করপোরেট গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে স্পষ্টত আপস করেছে। একজন করপোরেট আইনজীবী এই ব্যাংকারের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, এটি আসলে সুশাসনের বিষয়।

সরকার ও আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল আইএফআইসির কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, এসটিএল মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যবসা শুরু করেছে এবং এখন পর্যন্ত তার কোন আয় নেই। কিন্তু বন্ডে বিনিয়োগকারীদেরকে একেবারে প্রথম থেকেই টাকা ফেরত দিতে হবে। তিনি বলেন, শুরু থেকেই তারা কীভাবে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিবে?

কোনো বিনিয়োগকারী এক লাখ টাকার বন্ড কিনলে পরবর্তী ৬০ মাসের জন্য সুদ বাবদ প্রতি মাসে এক হাজার টাকা পাবেন। ম্যাচুরিটির পর তিনি মূল অর্থ ফেরত পাবেন। তহবিল সংগ্রহের জন্য এটি সম্পূর্ণ একটি অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফারুক আহমেদ এই উদ্যোগকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও অভিহিত করেছে। তিনি বলেন, আমি জানি না বিএসইসি কীভাবে বিশাল আকারের এই বন্ড অনুমোদন দিয়েছে।

ডেট সিকিউরিটিজ রুলস-২০২১ অনুযায়ী, বছর বছর ভালো মুনাফা ও নগদ টাকা নিয়ে লেনদেন করার ভালো ট্র্যাক রেকর্ড থাকলে একটি কোম্পানি বন্ড ইস্যুর জন্য কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারে।

তবে কোনো নতুন বা গ্রিনফিল্ড প্রকল্প হলে ভালো মুনাফা ও তারল্যের প্রাক্কলন থাকতে হবে যেন কোম্পানিটির অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা বোঝা যায়। এসটিএল একটি প্রক্ষেপণ তুলে ধরেছে আগামীতে ভালো মুনাফা করার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা এটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

বন্ড ইস্যু পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, স্পষ্টভাবে এটি একটি সম্পর্কিত দুই পক্ষের লেনদেন। কারণ আইএফআইসির পরিচালকদের কোম্পানির এসটিএলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আছে।

তিনি বলেন, বন্ড ইস্যু করে তহবিল সংগ্রহ খুব সহজ। কারণ এক্ষেত্রে কোম্পানিকে লাভজনক হওয়ার শর্ত আইনে নেই। তাছাড়া এটি বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে নতুন একটি প্রডাক্ট, তাই লাভজনক রেট দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

বন্ড সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখার পর তিনি বলেন, রাজনৈতিক চাপ থাকলেই এ ধরনের বন্ড অনুমোদন সম্ভব। তবে বিএসইসি বলছে, তারা নিয়ম মেনেই এটি করেছে।

বন্ডের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যি বিচ্যুতি

জিরো-কুপন বন্ড একটি ঋণ উপকরণ, যা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে। এতে মাসিক সুদ দেওয়া হয় না। তার পরিবর্তে বন্ডের একটি গায়ের দাম নির্ধারণ করা হয়। আর ইস্যু করার সময় তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হয়।

ফলে, যখন মেয়াদ শেষ হয় তখন বিনিয়োগকারীরা নির্ধারিত গায়ের দাম পান, যা ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি। আর এটিই বিনিযোগকরীর মুনাফা।

সাধারণত জিরো-কুপন বন্ডের ইস্যুকারী বার্ষিক বা মেয়াদপূর্তির পর অর্থ পরিশোধ করে। তাই এখানে মাসিক সুদ বা কুপন দেওয়ার মাধ্যমে ইস্যুকারী জিরো-কুপন বন্ডের বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

টাউনশিপ প্রকল্প

এসটিএল জানিয়েছে, ঢাকা সংলগ্ন শিল্প জেলা গাজীপুরের ছোট গোবিন্দপুরে ৭৬ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে একটি টাউনশিপ গড়ে তোলা হবে। ৩৭ একর জমিতে বাণিজ্যিক ভবন ও ২৩ লাখ বর্গফুট আবাসিক সুবিধা থাকবে। এসটিএলের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এটি নির্মাণ করা হবে।

৬ হাজার ৯৪ কোটি টাকার মধ্যে ইক্যুইটি থেকে ৩৩৫ কোটি টাকা, বন্ড থেকে ১ হাজার কোটি টাকা, জমির দাম হিসেবে জমির মালিক থেকে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা এবং ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস যারা কিনবেন তাদের অগ্রিম থেকে ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা আসবে।

প্রতিষ্ঠানটি সব ফ্ল্যাট ও স্পেস বিক্রি করে ৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা আয় করবে বলে আশা করছে।

নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিলের মাত্র ২৩ দিনের আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১২ জুলাই বিএসইসির কাছ থেকে বন্ডের অনুমোদন পায় এসটিএল। এই সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি কোনো টাকা আয় করেনি। বরং লোকসান হয়েছে ১৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, তাদের সম্পদের পরিমাণ ৩৩৪ কোটি টাকা।

এমন একটি কোম্পানির অনুমোদন এসেছে মাত্র তিন মাসের মধ্যে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক গভর্নর আর্থিকভাবে দুর্বল এমন একটি কোম্পানিকে এত দ্রুত অনুমোদন দেওয়াকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

এসটিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউজ্জামান এবং পরিচালক তিলাত শাহরিন যৌথভাবে ১০০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। নথিতে তাদের সম্পর্কে আর কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি। এসটিএলের ওয়েবসাইটেও তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসটিএল জানায়, তাদের প্রকল্পটি গাজীপুর-সাভার এলাকায় অবস্থিত, যেখানে শত শত কারখানা আছে। সুতরাং সেখানে অফিস স্পেস, হোটেল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার চাহিদা আছে।

ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেসের বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও সাড়া ফেলতে এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিপণন প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

এসটিএলের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার আব্দুল জব্বার এক ইমেইলে বলেন, সম্ভাব্য ক্রেতাদের অর্থায়নের সুবিধার্থে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই এলাকায় এই ধরনের উদ্যোগ প্রথম। তবে আমরা মনে করছি যে কোনো ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস অবিক্রীত থাকবে না।

তিনি বলেন, বরং আমরা পরিকল্পনা করেছি, প্রথম প্রকল্পটি শেষ হলে ওই এলাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

তবে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী বলেছেন, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে রিয়েল এস্টেট খাত কঠিন সময় পার করছে। এসটিএল প্রকল্পটি বিশাল এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশব্যাপী ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে ১০ হাজার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১২ হাজার। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় বিক্রি ১৪ হাজার।

এসব বিষয়ে জানতে বারবার চেষ্টা করা হলেও আইএফআইসির কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে বেক্সিমকো উত্তর দিয়েছে এবং আইএফআইসির কোম্পানি সচিব মোকাম্মেল হক বলেন, বেক্সিমকোর বক্তব্যই আইএফআইসির বক্তব্য।

বেক্সিমকো তাদের উত্তরে জানায়, এলাকাটি সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের জন্য উপযুক্ত এবং ব্যাপক চাহিদা আছে। কারণ প্রকল্পটি ঢাকাসংলগ্ন।

শিল্প গ্রুপটি জানিয়েছে, ব্যাংকের পরিচালকদের সুবিধা দিতে আইএফআইসি এসটিএল গ্যারান্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।

বেক্সিমকো আরও জানায়, এসটিএলের পরিশোধিত মূলধন এক হাজার কোটি টাকার নন-ফান্ডেড এক্সপোজারের বিপরীতে যথেষ্টর চেয়ে অনেক বেশি।

২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এসটিএলের অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৩৫ কোটি টাকা। বেক্সিমকো বলেছে, প্রাক্কলিত নগদ অর্থের যে সরবরাহ সেটিও টাকা পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত।

বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ৩৭ একর জমির জামানতের মাধ্যমে নন-ফান্ডেড এই সুবিধাটি যথেষ্ট পরিমাণে সুরক্ষিত। ‘এটি ব্যাংকের জন্য একটি বাড়তি সুরক্ষা।’

তারা আরও জানিয়েছে, এসব বিশ্লেষণের পরই বেক্সিমকো গ্রুপ এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আইএফআইসির বোর্ড ব্যাংক ও আমানতকারীদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও সুবিধা বিবেচনা করে গ্যারান্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যা বলছেন নিয়ন্ত্রকরা

বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানটি নতুন হলেও এর ইক্যুইটি কম নয়। তিনি বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ায় বিএসইসি বন্ডটির অনুমোদন দিয়েছে।

তিনি বলেন, যেহেতু এসটিএল একটি নতুন কোম্পানি, তাই এর আয় আসতে সময় লাগবে। ফলে, একটি ব্যাংক প্রথমে কোম্পানির পক্ষে অর্থ প্রদান করবে এবং পরে কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ ফেরত নেবে।

সুতরাং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি খুব কম। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য গ্যারান্টির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই ঝুঁকি যাই থাকুক না কেন, তা ব্যাংকের থাকবে- বন্ড বিনিয়োগকারীরা সমস্যায় পড়বে না, যোগ করেন তিনি।

ব্যাংক সব কিছু বিশ্লেষণ করেই গ্যারান্টি দিয়েছে জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ডেট সিকিউরিটিজ রুলস অনুযায়ী এসটিএল অনুমোদন পেয়েছে। আমরা আশাবাদী কোম্পানিটি খেলাপি হবে না।

মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে যে ধরনের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কথা বলা হচ্ছে, তা অবৈধ নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, যেহেতু আইএফআইসি ব্যাংক বন্ড ইস্যুকারী নয়, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে তারা অনুমোদন নেয়নি। তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বন্ডে ইস্যুকারী এসটিএল আইএফআইসির নাম ব্যবহার করেছে দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বিগ্ন। কারণ এতে মনে হয়েছে, বন্ড ব্যাংকই ইস্যু করেছে।

তিনি আইএফআইসির গ্যারান্টি দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রত্যাশিত আয় এবং টাউনশিপ তৈরি করা কঠিন হবে।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে, কিন্তু তারা এখনো কোনো ব্যাখ্যা পায়নি।

বিশ্লেষকরা উদ্বিগ্ন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নর প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে আইএফআইসির পরিচালনা পর্ষদ নতুন কোম্পানির পক্ষে এত বড় অঙ্কের গ্যারান্টি দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে।

তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে, আমানতকারীদের অর্থের বিনিমেয়ে ব্যাংকটি বড় ঝুঁকি নিয়েছে।

তিনি বলেন, একটি ব্যাংক এটি করার কোনো অধিকার রাখে না, কারণ আমানতকারীরা মূলত তাদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে ব্যাংকে রাখে। কোনো ব্যাংক তাদের সঞ্চয়কারীদের ঝুঁকিতে ফেলছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান বলেন, ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা থেকে বিরত রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে স্বতন্ত্র পরিচালক রয়েছেন ও সরকারের পক্ষ থেকেও পরিচালক আছেন। কিন্তু, তারা কী করেছেন?

তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইএফআইসি এসটিএলএর পিছনে থাকা মানুষদের সুবিধা বাড়াতে গ্যারান্টি দিয়েছে।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মনে করেন, বন্ড ইস্যুটি বিএসইসির গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। আমার মতে, সময় হওয়ার আগেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

মার্চেন্ট ব্যাংকার বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত- কাউকে বন্ডের অপব্যবহার করার অনুমতি না দেওয়া।

তিনি বলেন, ইস্যুকারী আসলেই বিনিয়োগকারীদের তহবিল ফেরত দিতে সক্ষম কিনা তা তদন্ত করা উচিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখনো তহবিল স্থগিত রেখে ও প্রকল্পের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে পারে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top