সকল মেনু

বাজেটেও আসছে নেতিবাচক সংবাদ

শেয়ারবাজার নজিরবিহীন পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত পুঁজি প্রতিদিনই উধাও হচ্ছে। শুধু গত সাত কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক কমেছে ৩৫৪ পয়েন্ট।

এ সময়ে বাজার মূলধন কমেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। কোনোদিক থেকেই আশার আলো আসছে না। এমনকি আশার আলো আনার জন্য কার্যকর কোনো চেষ্টাও বিদ্যমান নেই।

এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটেও শেয়ারবাজারের জন্য কিছু নেতিবাচক খবর অপেক্ষা করছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে। অনেকে এমন দুঃসংবাদ আঁচ করতে পেরে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের এ সমস্যা অনেক দিনের। এখানে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দুরবস্থা। সবকিছু মিলে শেয়ারবাজারে হতাশার কালো মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এমনটিই বলছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, শেয়ারবাজারের ব্যাপারে আপাতত কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। কারণ, আগামী বাজেট নিয়ে পত্রপত্রিকায় যেসব খবর আসছে, তার মূলকথা হলো-শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের কোনো ভাবনা নেই।

তিনি বলেন, বাজারের অংশীজনদের দাবি ছিল-তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করের পার্থক্য বাড়ানো। কিন্তু এই পার্থক্য এবার কমিয়ে আনা হচ্ছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ পার্থক্য হবে মাত্র আড়াই শতাংশ।

কারণ, তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির কর কমানো হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আইটি খাতে যে কর অব্যাহতি সুবিধা ছিল, সেটিও শেষ হয়ে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, গেইন ট্যাক্স বা মূলধনি মুনাফার কর আরোপের কথা শোনা যাচ্ছে। এসব খবর সত্য হলে তা অবশ্যই শেয়ারবাজারের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ মে ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজার ৬৬৬ পয়েন্ট। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা কমে ৫ হাজার ৩১২ পয়েন্টে নেমেছে। এ হিসাবে মাত্র ৭ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক কমেছে ৩৫৪ পয়েন্ট।

এ সময়ে বাজার মূলধন ৭ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৬ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে বাজার মূলধন ৫৮ হাজার কোটি টাকা কমেছে। ডিএসইর সূচকের এই অবস্থান সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এছাড়াও সাড়ে তিন বছরে ডিএসইতে ৪০টির মতো কোম্পানি যোগ হয়েছে। এসব কোম্পানি বাদ দিয়ে হিসাব করলে বাজারের এ পতন ইতিহাসে রেকর্ড অবস্থানে থাকবে। কারণ, দুই শতাধিক কোম্পানির শেয়ারের ক্রেতাই নেই। এসব কোম্পানির কোনো কোনো শেয়ারের দাম ২ থেকে ৩ টাকার মধ্যে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আড়াই শতাংশ করে বাড়ানো হচ্ছে। যেসব কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার হস্তান্তর করেছে, বর্তমানে ওই কোম্পানির করহার ২০ শতাংশ।

আগামী বাজেটে তা আড়াই শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ করা হচ্ছে। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশের কম শেয়ার হস্তান্তর করেছে, তাদের করহার সাড়ে ২২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে।

ফলে নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে নিরুৎসাহিত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, শেয়ারবাজারে মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হবে। এক্ষেত্রে যেসব বিনিয়োগকারী বছরে শেয়ারবাজার থেকে ৪০ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করে, তাদেরকে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারী সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার বেচাকেনা করে ৪১ লাখ টাকা আয় করলে তাকে ১৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

বাজারে পতনের জন্য এটিই অন্যতম কারণ। কেননা, অনেক বড় বিনিয়োগকারী বাজার থেকে বেশি মুনাফা করে। এর মধ্যে অনেকে বেনামে শেয়ার কেনাবেচা অব্যাহত রেখেছে। তাই তাদেরকে কর দিতে হয় না। কিন্তু নতুনভাবে কর আরোপ করা হলে পর্দার আড়ালে থাকা রাঘববোয়ালরাও চিহ্নিত হয়ে যাবে। এছাড়াও দীর্ঘদিন পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা পেয়ে আসছিল দেশের আইটি খাত। তবে আগামী অর্থবছরে এ সুযোগ আর থাকছে না। যদি নতুন করে এ সুবিধা বাড়ানো না হয়, তাহলে শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা বা সূচকগুলো ক্রমেই খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে অর্থনীতির যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ফোরকাস্ট বা পূর্বাভাসও ভালো কোনো খবর দিচ্ছে না। এছাড়া ডলার সংকটের কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফা নিতে পারছে না। এজন্য তারা ভালো লভ্যাংশও দিচ্ছে না।

এছাড়াও বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা আমানতকারীদের জন্য আকর্ষণীয়। তারল্য সংকটের কারণে আমানতের জন্য ব্যাংকগুলো হাহাকার করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সুদের হারের সীমা তুলে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এতে ইচ্ছামতো সুদের হার নির্ধারণ করছে ব্যাংক। অঘোষিতভাবে বেশকিছু ব্যাংক আমানতের বিপরীতে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।

ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বল্প মেয়াদে হলেও ব্যাংকে টাকা রাখছে। অন্যদিকে হঠাৎ করেই মার্কিন ডলারের দাম ৮ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এক ডলার কিনতে ১১৮ টাকা লাগে। ডলারের এ দাম কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসাবে ডলার কিনছে।

তারা বলছেন, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সার্বিক বিবেচনায় শেয়ারবাজারে জন্য ইতিবাচক কোনো খবর আপাতত মিলছে না। আর বাজার খারাপ হলে মূলত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারও এর ব্যত্যয় হবে না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top