স্টাফ রিপোর্টার : অর্থ লুটপাট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৩০ লাখ ডলার খরচ করার অভিযোগে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন করে যুক্ত হওয়া অভিযোগের বিষয়ে এরইমধ্যে ৭ ধরনের নথিপত্র তলব করেছে সংস্থাটি।
রোববার (১৯ জুন) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সংস্থাটির পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে পৃথক দুটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো চিঠিতে যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: মেসার্স ইপস্ ট্রেডিংয়ের ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের নিমতলী শাখার চলতি হিসাব খোলার আবেদন, ছবিসহ নমুনা স্বাক্ষরকার্ড, কেওয়াইসি ফরম এবং টিপি ও চলতি হিসাব বিবরণী শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ঢাকার কাওরানবাজারে এনবিএল টাওয়ারে বিনিয়োগ ও নির্মাণ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র। যেমন- প্রাক্কলন, টেন্ডার, ঠিকাদার নির্বাচন, কার্যাদেশ, কাজ সম্পাদন হওয়া সংক্রান্ত প্রত্যয়ন, বিল প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র। এছাড়া যৌথ বিনিয়োগ হয়ে থাকলে চুক্তিপত্র ও ঋণ দেওয়া সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র।
চট্টগ্রামের এনবিএল টাওয়ার নির্মাণ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র। যার মধ্যে রয়েছে প্রাক্কলন, টেন্ডার, ঠিকাদান নির্বাচন, কার্যাদেশ, কাজ সম্পাদন সংক্রান্ত প্রত্যয়ন ও বিল প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র।
রন হক সিকদার, রিক হক সিকদার, জন হক সিকদার, মমতাজুল হক, মনিকা সিকদার খান, নাসিম হক সিকদার ও সৈয়দ কামরুল ইসলামের ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত যেসব ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা হয়েছে তৎসংশ্লিষ্ট যাবতীয় সব রেকর্ডপত্র। যার মধ্যে রয়েছে শুরু থেকে সবশেষ হিসাব বিবরণী ও টিপিসহ অন্যান্য কাগজপত্র।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক বরাবর পাঠানো অপর চিঠিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের পরিবারের সদস্য রন হক সিকদার, রিক হক সিকদার, জন হক সিকদার, মমতাজুল হক, মনিকা সিকদার খান, নাসিম হক সিকদার এবং সৈয়দ কামরুল ইসলামের নামে ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কোন তদন্ত করা হয়েছে কি না? হয়ে থাকলে সে সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন।
তবে এ সংক্রান্ত কোনো তদন্ত না হয়ে থাকে তাহলে ওই ব্যক্তিদের নামে ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঋণ বিতরণে নয়-ছয়ের অভিযোগ ওঠে। ঋণের অর্থের পরিমাণও কম নয়, তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারসহ পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, নামে-বেনামে জনগণের আমানতের অর্থ লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও টানা পাঁচ বছরে অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি দুদক। সংশ্লিষ্টরা জানান, দফায় দফায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা পড়লেও তা আর মামলায় গড়ায়নি। এর মধ্যে অনুসন্ধান পর্যায়ে নতুন নতুন অভিযোগও যোগ হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দুদক উপপরিচালক নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল তিন দফায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনের কাছে জমা দেয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের প্রথম দিকে অভিযোগটি পরিসমাপ্তির (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দিলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি। পরে ওই বছরের মার্চ মাসে দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করে পুনরায় অনুসন্ধানের নির্দেশনা দেয় কমিশন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের অক্টোবরে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মিলেনিয়াম গ্রুপকে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া খেলাপি ঋণ ছিল এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। যা খেলাপি হিসেবে দেখাতে আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। যেখানে ন্যাশনাল ব্যাংক ২০১৬ সালের শেষের দিকে মিলিনিয়াম গ্রুপকে ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ দেয়।
এছাড়া প্রিমিয়ার প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট, হামিদ রিয়েল এস্টেট, আফসার রিয়েল এস্টেট, ফ্রেন্ডস মাল্টি ট্রেড কোম্পানি ও মেসার্স চিটাগাং সিন্ডিকেটের নামে শত কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। এসব ঋণের প্রক্রিয়ায়ও অনিয়মের অভিযোগ মেলে।
২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ার পর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে নেন তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের ১৪টি কোম্পানির নামে গৃহীত ঋণের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।