বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কঠোর নির্দেশনার পরে বৃহস্পতিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের ৯১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করেছে এনবিআর। করের বিপরীতে বাস্তব সম্পদের তথ্য যাচাই করতেই এ উদ্যোগ, বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানটি।
এনবিআরের আয়কর বিভাগের রাজধানীর কর অঞ্চল-১৫ থেকে বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) এ সংক্রান্ত চিঠি সব ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
কর অঞ্চল-১৫ সূত্রে জানা গেছে, এস আলমের (সাইফুল আলম) স্ত্রী ফারজানা পারভীন, মা চেমন আরা বেগম এবং ভাই আবদুল্লাহ হাসানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের পিতা-মাতা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে বা বোনের যৌথ নামে অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের তথ্যও তলব করা হয়েছে। এর মানে, এস আলমসহ তাঁর পুরো পরিবারের সদস্যদের যাবতীয় ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে এনবিআর।
এস আলম শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। সদ্য বিদায়ী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী ছিল এস আলম গ্রুপ।
এ ছাড়া তাঁদের নামে থাকা ক্রেডিট কার্ডের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও ডাক বিভাগের কাছে থাকা হিসাবের তথ্য চেয়েছে কর অঞ্চল-১৫।
এস আলমের স্ত্রী ফারজানা পারভীন, ভাই আবদুল্লাহ হাসান হলেন এস আলম লাক্সারি চেয়ার কোচ সার্ভিস, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল লিমিটেডের পরিচালক। আর এস আলমের মা চেমন আরা বেগম এস আলম লাক্সারি চেয়ার কোচ সার্ভিসের পরিচালক।
এস আলম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে গত এক দশকে ব্যাংক দখল, অর্থ পাচারসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে তিনি এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর কর্মকর্তা জানান, এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের কর নথির সঙ্গে বাস্তব সম্পদের তথ্য যাচাইÑবাছাই করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুজন ডেপুটি গভর্ণরের তত্ত্ব¡াবধানে তথ্য গোপন করে পাহাড় সমান ঋণ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নও ও দুই ডেপুটির বিদায়ের পরে এই চিত্র ফুটে ওঠে। একইসঙ্গে তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলো ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় অর্থ চুষে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। নামে-বেনামে পাহাড় সমান ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতে পারছে না। এভাবে ৭টি ব্যাংক দখলে নিয়ে আগ্রাসন চালিয়েছে বলে গত সোমবার জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কর্মকর্তারা। স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন না থাকার এটি ভয়াবহ ফল বলেন তারা।
নিয়ন্ত্রণে থাকা ৭টি ব্যাংকের মধ্যে একটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। গত ১০ বছর আগে সব সূচকে উর্দ্ধে ছিল এই ব্যাংকটি। আইনকানুন পরিপালন, গ্রাহককে সেবা দেওয়া ও আর্থিক সূচকে অন্য সব ব্যাংককে ছাড়িয়ে গিয়েছিল এই ব্যাংক। গ্রাহকের আস্থার কারণে স্থানীয় আমানত কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে এটি সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। ব্যাংকটির আকার এতটাই বড় হয়ে উঠেছিল যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হতোÑ ইসলামী ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়লে পুরো খাতে ‘পদ্ধতিগত ঝুঁকি’ তৈরি হবে, যা রোধ করা সম্ভব হবে না।
কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে ২০১৭ সাল থেকে। ওই বছর সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইসলামী ব্যাংককে ‘জামায়াতমুক্ত’ করার উদ্যোগ হিসেবে এর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেয় সদ্য বিদায় নেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপ। এরপর সাড়ে সাত বছরে নামে-বেনামে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজশাহীর নাবিল গ্রুপ।
শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, আরও পাঁচটি ব্যাংক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ইচ্ছেমতো লুট করে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে সদ্য বিদায়ী আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। ঋণের নামে পাচার করা এই টাকা ব্যাংকে ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলো দেড় বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাহিদামতো টাকা জমা রাখতে পারছে না। কিন্তু সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বিশেষ সুবিধা দিয়ে এসব ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখেছিলেন। এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব সুবিধা কাটছাঁট করেছে। নতুন গভর্নর নিয়োগের পরে প্রথমে শাস্তির আওতায় পড়ছে গ্রুপটি।
© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)