Print

সর্বশেষ সংবাদ | Daily Stock BD

ভয়াবহ সংকটের পথে সামিট পাওয়ার

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২১, ২০২৪ , ১২:৩২ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ২১, ২০২৪, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার

শাহীনুর ইসলাম: ভয়াবহ সংকটের দিকে পথে হাঁটছে সামিট পাওয়ার গ্রুপ। সামিটের ১৫ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫টি কেন্দ্রের ১৬৮ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তিনটি কেন্দ্রের মেয়াদ চলতি বছরের মার্চে বাড়ানো হয়েছে এবং বাকি সাতটির মেয়াদও কমে আসছে।

সামিট পাওয়ারের চলতি বছরের মার্চে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন করে ৫ বছরের জন্য উৎপাদনের অনুমোদন পায়। তবে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সব মিলে গ্রুপের এক তৃতীয়াংশ কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। ফলে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের পথে হাঁটছে সামিট পাওয়ার।

সামিট কর্পোরেশন লিমিটেডের অধীনে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড (এসপিএল) মোট ৯৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক।

একই সঙ্গে, ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন করে অনুমোদন না হওয়ার আশঙ্কায় ফেনী, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী অবস্থিত মোট ৬৬ মেঘাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আগস্ট ও অক্টোবর মাসে কেন্দ্রেগুলোর সব যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেয় ডরিণ পাওয়ার কর্তৃপক্ষ।

  • গ্রুপের ১৫ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫টির উৎপাদন বন্ধ
  • ডরিণ পাওয়ারের তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব যন্ত্রাংশ বিক্রি
  • ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে পরিচালিত
  • বিদ্যুৎ ঘাটতিতে বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যহতের শঙ্কা

ডরিন পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) তাহজীব আলম সিদ্দিকী। তার বাবা নূরে আলম সিদ্দিকী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ছিলেন। ঝিনাইদহে জামায়াতে ইসলামির কর্মী আবদুস সালাম হত্যার ঘটনায় ১১ বছর পর গত ২৭ আগস্ট একটি মামলা করা হয়। এই মামলায় ৭ নভেম্বর রাতে ঢাকার সাভার থেকে ডরিণের ব্যবস্থাপক তাহজীব আলম সিদ্দিকীকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।

একধিক কেন্দ্র বন্ধে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির দিকে যাচ্ছে দেশ। ফলে আসছে বোরো মৌসুমে সেই ধাক্কা কৃষিতে লাগতে পারে। যা কৃষি প্রধান দেশে কৃষি পণ্য উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতিতে শঙ্কার প্রধান কারণ।

সামিট পাওয়ার গ্রুপ

সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মোট ৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তার মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র জাঙ্গালিয়া (গ্যাসভিত্তিক ৩৩ মেগাওয়াট) এবং মদনগঞ্জ (এইচএফও-ভিত্তিক ১০২ মেগাওয়াট) উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। তার আগে বন্ধ হওয়া বাকি তিনটি কেন্দ্র হলো- আশুলিয়া (গ্যাসভিত্তিক, ১১ মেগাওয়াট), মাধবদী (ইউনিট-১, গ্যাসভিত্তিক, ১১ মেগাওয়াট) এবং চান্দিনা (ইউনিট-১, গ্যাসভিত্তিক, ১১ মেগাওয়াট)। প্রতিষ্ঠানটির মোট পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে বলে গতকাল বুধবার তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)।

বর্তমানে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন ৮০৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অন্য মোট ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল আছে।

তথ্যানুসারে, গ্যাসের অভাব, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে চাহিদা না পাওয়ার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে চারটি গ্যাসভিত্তিক এবং একটি এইচএফও-ভিত্তিক। আশুলিয়া, মাধবদী ও চান্দিনা কেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ গত বছরের ৩১ আগস্ট শেষ হয়। নতুন করে ২০২৮ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে এসব কেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন করা হয়।

গ্রুপের আরো ৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনের মেয়াদ শেষের পথে যাচ্ছে। নতুন করে অনুমোদন না পেলে সংকট আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কোম্পানির পক্ষে মন্তব্য

সামিট পাওয়ার কোম্পানি সচিব স্বপন কুমার পাল ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। আরো তথ্যের জন্য গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগযোগ করতে বলেন তিনি।

তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ বৃদ্ধি

আশুলিয়া, মাধবদী ও চান্দিনায় অবস্থিত কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ৩০ মেগাওয়াট। চলতি বছরের ২৭ মার্চ সচিবালয়ে সরকারী ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে আরো ৫ বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে কেন্দ্র তিনটি পরিচালিত হবে। অর্থাৎ যখন সরকারের প্রয়োজন হবে, কেবল তখনই কেন্দ্র তিনটি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হবে। আর শুধু ওই বিদ্যুতের বিলই পাবে কেন্দ্র তিনটি।

কেন্দ্র তিনটি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির মেয়াদ গত বছরের বছরের ৩১ আগস্ট শেষ হয়ে যায়। নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর ফলে সরকার এসব কেন্দ্র থেকে আগামী পাঁচ বছর বিদ্যুৎ কিনবে। আশুলিয়া, মাধবদী ও চান্দিনায় অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০০৩ সালে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এবং কুমিল্লা পল্লীর সাথে ১৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) অধীনে স্বাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আইপিপি) হিসেবে স্থাপিত হয়।

২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা ৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। বর্ধিত চুক্তির মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট শেষ হয়ে গেলে কোম্পানিটি তা নবায়নের জন্য আবেদন করলে আজ সরকারী ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে তা অনুমোদন পায়।

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি

৩০ জুন, ২০২৪ তারিখে সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন ও লভ্যাংশ ঘোষণা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়েছে। এছাড়া চলতি ২০২৪-২৫ হিসাববছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই’২৪-সেপ্টেম্বর’২৪) এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর’২৪-ডিসেম্বর’২৪) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্যেও ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) সময় চেয়ে আবেদন করেছে কোম্পানিটি।

সামিট পাওয়ারের বিজ্ঞপ্তি

সামিট গ্রুপ ও সামিট পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বর্তমান অবস্থার কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে সামিট করপোরেশন লিমিটেডের মালিকানাধীন ২,২৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে। এ ছাড়া সামিট ৫০০ এমএমসিএফ/ডি ক্ষমতাসম্পন্ন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) পরিচালনা করে।

সামিট কর্পোরেশন লিমিটেডের অধীনে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড (এসপিএল) মোট ৯৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক।

বর্তমানে, আশুলিয়া, মাধবদী ও চান্দিনায় অবস্থিত তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র (মোট ৩৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন) জাতীয় গ্যাস গ্রিড থেকে সরবরাহে ঘাটতির জন্য শাটডাউন মোডে আছে। যদিও ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে ২১শে নভেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথে সরকারের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) রয়েছে।

চলতি বছরের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বিপিডিবির কাছ থেকে বিদ্যুতের চাহিদা না থাকায় নারায়গঞ্জে অবস্থিত মদনগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টটি (১০২ মেগাওয়াট, হেভি ফার্নেস ওয়েল-চালিত) শাটডাউন মোডে আছে।

চলতি বছরের ২৪ জুন বিপিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে জাঙ্গালিয়া পাওয়ার প্ল্যান্ট (৩৩ মেগাওয়াট গ্যাস-চালিত) বন্ধ রয়েছে। তবে বিপিডিবি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি (পিপিএ) নবায়ন কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে কোনো নির্দেশনা দেয়নি।

বর্তমানে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন ৮০৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অন্য মোট ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল আছে।

পৃথকভাবে, মোট ১,২৭৯ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সামিটের তিনটি টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র যথাক্রমে, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, সামিট মেঘনাঘাট ২ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের পাশাপাশি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) চালু রয়েছে।

সামিট পাওয়ার লিমিটেড অর্থ বছরের শেষে (৩০শে জুন ২০২৪ তারিখে) নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রদানের পাশাপাশি লভ্যাংশ ঘোষণা করার জন্য ৩১শে মার্চ ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত সময় বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছে।

সামিট পাওয়ার লিমিটেড আশা করছে এপ্রিল-মে ২০২৫ এর মধ্যে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে।

© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)