Print

সর্বশেষ সংবাদ | Daily Stock BD

এনবিআর বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত: মুখোমুখি সরকার ও রাজস্ব প্রশাসন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০২৫ , ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: মে ২২, ২০২৫, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার

শাহীনুর ইসলাম: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দ্বিখণ্ডিত করার (১২ মে ঘোষিত) অধ্যাদেশ নিয়ে ‘ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়েছে’ অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা জানালেও রাজস্ব প্রশাসন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এনবিআর বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তিন দিনের কলম বিরতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দুইপক্ষ।

ফলে চেয়ারম্যানকে লাগাতার অসহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও মানছেন না পরিষদ নেতারা। আন্দোলন সংঘটিত করতে অ্যাডহক কমিটি প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। অপরদিকে, সরকার ও রাজস্ব প্রশাসন ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে না পারায় দেশের আমদানী রপ্তানী-বাণিজ্য স্থবিরতা নামছে।

তবে সরকার জানিয়েছে, রাজস্ব টেকসই করতে এনবিআরকে দুইভাগ (পলিসি ও বাস্তবায়ন শাখা) করা বাধ্যতামূলক। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজস্ব সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এই অধ্যাদেশ জারি হয়েছে এবং তা বহাল থাকবে। এমন ঘোষণায় এনবিআরের রাজস্ব প্রশাসন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে যে, সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশ সরকার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি এবং সংস্কার ছাড়াই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে না পারায় ‘এনবিআর চেয়ারম্যানকে লাগাতার অসহযোগিতা করা হবে’ বলে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা করেছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। সেই সঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান অপসারণসহ তিন দফা দাবিতে গতকাল বুধবার থেকে অবস্থান নিয়েছেন পরিষদের নেতারা।

ফলে সরকার ও রাজস্ব প্রশাসনের দ্বিমুখী অবস্থানে ভেস্তে যেতে বসেছে দেশের আমদানী রপ্তানী-বাণিজ্য। এনবিআরের ঘোষিত অধ্যাদেশ বাতিলসহ বিভিন্ন দাবি পূরণের স্লোগানের শহরে পরিণত হয়েছে ঢাকা। এর আগে ১৪-১৫ ও ১৭-১৯ মে পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন দপ্তরে আংশিক কলমবিরতি পালন করা হয়।

এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে গতকাল বিকালে বলা হয়েছে, জারিকৃত অধ্যাদেশ বাতিল, এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ ও পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনের পরই ‘এনবিআর চেয়ারম্যানকে লাগাতার অসহযোগিতা’ কর্মসূচি গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে বৈঠকে ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে না পারায় মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে সরকার ও রাজস্ব প্রশাসন।

এনবিআরে মুখোমুখি অবস্থান সম্পর্কে সিপিডির সম্মানিত ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এনবিআর দুইভাগ করা ঠিক আছে। তবে প্রক্রিয়া ঠিক হয়নি। আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ বিভক্ত করা হয়েছে। এটা আমাদের শ্বেতপত্রেও সুপারিশ করা ছিল। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি।’

তবে প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘টাস্কফোর্সের যে সুপারিশ ছিল, সেটা ধরে যে গতি আসার কথা ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ ছিল।’

‘রাজস্ব আহরণ টেকসই করতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলেন এনবিআরের সদস্য জিএম আবুল কালাম কায়কোবাদ। তিনি বলেন, ‘আইএমএফের নির্দেশনায় পলিসিগত কিছু পরির্তন আনা দরকার। অন্তর্বর্তী সরকারও আমলে নিয়ে কাজ করছেÑ এনবিআর দুইভাগ করা তারই একটি অংশ’ বলেন তিনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দ্বিখণ্ডিত করে ১২ মে সরকার এনবিআর বিলুপ্ত করার অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে এনবিআরের অধীন কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল দুপুরে আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন এনবিআরের অতিরিক্ত কর কমিশনার হাসিনা আক্তার, উপ-কর কমিশনার শাহাদাত জামিল শাওন ও মোস্তফিজুর রহমানসহ পরিষদের সিনিয়র কর্মকর্তারা।

আন্দোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এত বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মতামত না নিয়ে অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করা হয়। ফলে এর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

তারা বলেন, ২০ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সভায় এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। সভায় অর্থ উপদেষ্টা ছাড়াও দুজন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। রাজস্ব সংস্কার পরামর্শক কমিটির সদস্য, এনবিআরের সাবেক সদস্য, অর্থ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধিদলের অভিযোগ, ১৩ জনের মধ্যে মাত্র ২ জনকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়।

অর্থ উপদেষ্টা সভার শুরুতেই জানান, তিনি দীর্ঘ আলোচনা করবেন না এবং ছয় থেকে সাত মিনিটের মধ্যে বক্তব্য শেষ করতে হবে। সভায় রাজস্ব সংস্কার পরামর্শক কমিটির সদস্যরা বলেন, জারিকৃত অধ্যাদেশ তাঁদের সুপারিশের প্রতিফলন নয়। তাঁরা এনবিআর অক্ষুণ্ন রেখে কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই নতুন দুই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে সভায় উপস্থিত দুজন উপদেষ্টা অধ্যাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন।

তবে ‘পরামর্শক কমিটির সুপারিশে নতুন অধ্যাদেশ করা হয়েছে’ বলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজস্ব সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি বলেন, ‘যারা সরকারের মঙ্গল চায় না, তারাই বিরোধিতা করছেন। তবে সুপারিশে থাকা একটি শব্দের এপিট-ওপিট হতে পারে কিন্তু প্রতিপলিত হয়েছে। সব মিলে কিছু বিচ্যুতি থাকতে পারে’ বলেন সাবেক আমলা আব্দুল মজিদ।

তবে ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনকারীদের দাবি, এনবিআর চেয়ারম্যান সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপন না করে প্রকৃত অবস্থা আড়াল করেছেন। ফলে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

পরবর্তী কর্মসূচি: আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের দাবি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান; এনবিআর এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নিজ নিজ দপ্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন। তবে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা এর আওতামুক্ত থাকবে। ২৪ ও ২৫ মে কাস্টম হাউস, এলসি স্টেশন ব্যতীত ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি। এই দুই দিন কাস্টম হাউস, এলসি স্টেশনগুলোয় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।

তবে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা কর্মবিরতির আওতামুক্ত থাকবে। ২৬ মে থেকে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা ব্যতীত ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি চলবে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আন্দোলন আরও সংগঠিত করার লক্ষ্যে এনবিআরের তিন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে। আজ বৃহস্পতিবার গ্রেড-১০ ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশ করা হবে।

© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)