প্রস্তাবিত বাজেটে কর নায্যতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। উন্নত দেশগুলোতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়, এখানে তা নেই। ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের বাজটে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পারলে ভালো হবে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ জুলাইÑ গণঅভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী; নেতিবাচক হওয়ায় এটাতে সমর্থন করে না বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে সিপিডি জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থায় সরকার ব্যক্তি পর্যায়ে করা বৃদ্ধি করেছে। এজন্য কর কর্তৃপক্ষের কর আইন ও বিধিমালা প্রয়োগের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। অন্তর্বর্তী সরকার যখন অবৈধ আয়, অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন এ ধরনের উদ্যোগ জনগণের কাছে ভুল বার্তা পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। বাজেটে কিছু বিষয়ে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ এবং কর কাঠামোর ৬টি শ্রেণি করায় নিম্নবিত্তদের করহার বড়বে।
বাজেটে টাকা সাদা করার সুযোগ গণঅভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে সিপিডির সংশয় প্রকাশ
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে
করকাঠামোর ৬টি শ্রেণিতে নিম্নবিত্তদের করহার বেশি হবে
বাজেটে কর নায্যতায় ঘাটতি, আয়ের-ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে মঙ্গলবার এসব তুলে ধরে সিপিডির গবেষকরা। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেল বাজেট বিশ্লেষণে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ আরো অনেকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে জাতীয় বাজেট পেশ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা জিডিপির ১২.৭ শতাংশ।
বাজেট বিশ্লেষণে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ জুলাইÑগণঅভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী। আমরা সব সময় বলে আসছিÑ অবৈধ অর্থ বৈধ করার এ ধরনের সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। নেতিবাচক হওয়ায় এটাতে আমরা সমর্থন করি না।’
তিনি বলেন, ‘নতুন করে টাকা পাচার হবে না, অনেকটা বন্ধ হয়েছে। যারা পাচার করেছে তাদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করা বিষয়ে অধিক কর দিয়ে হলেও এটাকে আমরা সমর্থন করি না। বাজেটে বড় ধরনের পূর্বাভাস পাচ্ছি না। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করচাপ বাড়বে।’
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়, এখানে তা নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে দুই তৃতীয়াংশ অপ্রত্যাক্ষ কর। আয়ের সঙ্গে ব্যায়ের কোন সামঞ্জস্য নেই। পরে রাজনীতিক সরকার যখন আসবে, তখন কি হবেÑ বলা যাচ্ছে না।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সব সময় রাজস্ব আদায় একই ধারায় রয়েছে। এবারও উচ্চ আকাঙ্খার রাজস্ব আহরণ বাজেটের বড় চিন্তার বিষয়। গত ১০ বছর ধরেই আমরা দেখছি, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম লাগবে।’
গত তিন বছর থেকে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ হারে খেলাপি ঋণের কারণে অর্থনীতি একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচক ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। এর মধ্যে রেমিটেন্স ও রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক দায় পরিশোধ সক্ষমতা বেড়েছে।’
এমন প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আনা এবং মূল্যস্ফীতি কমানোই আগামী বাজেটের মূল্য লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদা। তিনি বলেন, ‘বাজেটে সেই পদক্ষেপ ও কৌশল বিস্তারিত থাকা দরকার। অতীতে এ ধরনের বিধান দেওয়া সত্ত্বেও যথেষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়নি।’
টাকা সাদা করা সম্পর্কে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যদি কোনো সরকার অবৈধ আয়কে বৈধতা দিতে চায়, তবে তা কঠোরভাবে এককালীন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এতে বৈষম্য বাড়বে। এটা নৈতিকতার ওপর আঘাত। এভাবে আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলে আবাসনের দাম বেড়ে যায়। আবাসন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যায়।’
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সামগ্রিকভাবে চলমান অর্থনৈতিক সংকট আমলে নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সংকট মোকাবিলায় এসব সংকট আমলে নেওয়া দরকার ছিল। রাজস্বসংক্রান্ত বেশ কিছু উদ্যোগ বাজেটে ঘোষিত সমতামুখী ও টেকসই উন্নয়নকাঠামোর ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
প্রস্তাবিত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এসব উদ্দেশ্যের পেছনে ব্যবস্থা বা পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এছাড়াও বাজেটের থিম ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠন হলেও কিছুটা রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সিপিডির মূলপ্রবন্ধে বলা হয়Ñ প্রস্তাবিত বাজেট আকারের দিক থেকে ব্যতিক্রমী। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ছোট। এই বাজেটে প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর এবং ভৌত অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এসব উদ্দেশ্যের পেছনে বাজেট ব্যবস্থা বা পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে কর ছাড়, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও প্রণোদনা এবং ক্ষতিকর কার্যকলাপের ওপর উচ্চ হারে কর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেট চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সামগ্রিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা জনগণ ও ব্যবসার জন্য বাস্তবিক স্বস্তি আনতে পারত।
সিপিডি আশা করে, অর্থ উপদেষ্টা বাজেটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, বিশেষ করে অঘোষিত আয় বৈধ করার মতো বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করবে। কঠিন সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিছু কিছু উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করে সিপিডি। করকাঠামো বিন্যাস করতে গিয়ে ছয়টি শ্রেণি করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, নিম্নবিত্ত মানুষের করহার বেশি হবে, কিন্তু উচ্চবিত্তদের কম পড়বে। এটা বৈষম্যমূলক।
এদিকে ভবিষ্যতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সিপিডি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল গঠনের সিদ্ধান্তকেও সাধুবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, এটা বড় লক্ষ্যমাত্রা। তাই বাজেটের আকার খুব ছোট বলা যাবে না বলেন গবেষকরা।
© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)