ফারজানা লাবনী: নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের পরও দেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। প্রস্তুতি নিয়েও অনেকে বিনিয়োগ করছেন না। একই মত জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর সরকার গঠিত হলে রাজনৈতিক স্থিরতা বজায় থাকবে। তথ্য সূত্র: খবরের কাগজ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দিয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর দায়িত্বে আছে এমন সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। অভিজ্ঞ দক্ষ ব্যক্তিদের বিনিয়োগ বাড়ানোর কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি অনেক নামিদামি বিনিয়োগকারীর উপস্থিতিতে বিনিয়োগ সামিট করা হয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘দেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। যেকোনো বিনিয়োগকারী, দেশি হোক বা বিদেশি- আগে নিরাপদ ও পূর্বানুমেয় পরিবেশ খোঁজ করেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা হলে ব্যবসায়িক আস্থা কমে যায়, উৎপাদন ব্যাহত হয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে সব মহলের উচিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে একটি সহনশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।’
তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, শিল্প-বিনিয়োগের অনেক বাধা এখনো দূর হয়নি। এসব বাধার মধ্যেও অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনেকে বিনিয়োগ নিবন্ধনও করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় কারখানা খোলা রাখা যায় না, স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। কারখানায় আয় না থাকলেও শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাসসহ সব ধরনের খরচ ঠিকই চালাতে হয়। ফলে বিনিয়োগকারী বিপাকে পড়েন। কে এই লোকসান নিতে চায়? তার চেয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিনিয়োগ না করাই ভালো।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনা করে বিনিয়োগ আহ্বান জানালে দেশে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে, এমন দাবি করে সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। অর্থনীতিতে গতি আসবে। রাজস্ব আদায় বাড়বে। বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমবে। সরকারের আয় বাড়বে। নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়বে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) মন্দাভাব চলছিল। গত বছরের শেষ ছয় মাসে তা ৭১ শতাংশ কমে যায়। তবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) এফডিআই আসার হার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট ১৫৮ কোটি ডলারের এফডিআই আসে। এর মধ্যে ৭১ কোটি ডলার আবার ফেরত নিয়ে গিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সময়ে দেশি-বিদেশি অনেকে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছেন। অনেকে নতুন বিনিয়োগ করতে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা না থাকায় বিনিয়োগ করেও তা আবার প্রত্যাহার করেছেন।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি ছিল। বিনিয়োগ করার জন্য সাধারণ ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর এ পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টালেও দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা এখনো আসেনি।
ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে শিল্প-বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। পুঁজি ব্যয় করার আগে বিনিয়োগকারী অবশ্যই খতিয়ে দেখবেন লগ্নি হলে তার কতটা ফেরত আসার সম্ভাবনা আছে। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলাসহ প্রায় খাতে স্থিতিশীলতা আসবে। অনেক বিনিয়োগকারী প্রস্তুতি নিয়েও নির্বাচিত সরকারের অধীন বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেকে এরই মধ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েও শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠায় পিছিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তাই নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘দেশে শিল্প-বিনিযোগ বাড়াতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। শিল্প স্থাপন করতে হলে বড় ধরনের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। আমার প্রশ্ন- এতদিন দেশে বিনিয়োগের জন্য যেসব বাধা ছিল তার সবটা দূর করা কি সম্ভব হয়েছে? এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যোগ হলে কীভাবে বিনিয়োগ বাড়বে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এস কে মুজেরি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে আস্থা পান না। দেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের পরিস্থিতি ভালোভাবে জানেন। তারা অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। দেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে না এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হন না। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া কেউ বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ জরুরি।
© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)