Print

সর্বশেষ সংবাদ | Daily Stock BD

নতুন বেতন স্কেলের সুপারিশ, বেসরকারি খাতে চাপ বাড়বে

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২২, ২০২৬ , ৫:০৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ৫:০৪ অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার

দেশের বেসরকারি খাত বর্তমানে এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এ বাস্তবতায় নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়াই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দ্বিগুণের বেশি হারে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সমাজে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে করে বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি বড় অংশ নতুন করে চাপে পড়বে।

বর্তমানে সরকারের নিজস্ব আয়ের বড় অংশই পরিচালনে ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে, উন্নয়ন কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে ঋণনির্ভর অর্থায়নের মাধ্যমে। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয়ের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রস্তাবিত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়লে অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি বাজেটে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকার নতুন করে ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতার ব্যয় নির্বাহ করবে– এ প্রশ্নও উঠছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ঋণ করে নিয়মিত বেতন-ভাতা ও পেনশনের মতো ব্যয় মেটানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হবে না। এতে রাজস্ব ও ঋণের চাপ আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিতে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়তি করের বোঝা নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাত সেই চাপ নিতে প্রস্তুত কিনা, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে ২০১৫ সালে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫ ও ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছেন।

এ ছাড়া সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতাও তারা ভোগ করছেন। সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে ২০১৫ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় এ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি কিছুটা কম থাকতে পারে। তাই বলে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব যুক্তিসংগত নয়। বর্তমানে সেই আর্থিক পরিস্থিতি নেই।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ঘুষ-দুর্নীতি কমানো এবং সরকারি কাজে গতি আনার যুক্তিতে অতীতেও বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সমস্যার খুব একটা সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় পুরো অংশই পরিচালন ব্যয়ে ব্যয় হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য যদি অযৌক্তিকভাবে শুল্ক-কর বাড়ানো হয়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, প্রায়ই অনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে দেয়।

তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ কার্যকর হলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। তবুও সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে এর প্রভাব পড়বে, যা সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বেসরকারি খাত-সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

ফলে শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত এখন স্পষ্ট চাপের মুখে রয়েছে।

© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)