Print

সর্বশেষ সংবাদ | Daily Stock BD

খান ব্রাদার্স ওভেন ব্যাগ আর্থিক অনিয়মে জর্জরিত

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬ , ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার

ব্যাপক আর্থিক অনিয়মে জর্জারিত হয়ে পড়েছে বিবিধখাতের কোম্পানি খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ড্রাষ্ট্রিজ লিমিটেড। কোম্পানিটির আর্থিক হিসাব বিবরনীতে দীর্ঘদিনের অপরিবর্তিত মজুদ, আদায়বিহীন পাওনা, ঝুঁকিপূর্ণ এফডিআর, কর ও ভ্যাট বকেয়া, হিসাববই ও সম্পদ রেজিস্টারের নথি না থাকায় ব্যবসা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পাশাপাশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের উপর সম্পূর্ণরুপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে বড় উদ্বেগ রয়েছে। এমনকি কোম্পানিটির ব্যবসা কাযক্রম টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর শঙ্কা রয়েছে।

খান ব্রাদার্সের পিপি ওভেন ব্যাগের এমন ভয়াবহ চিত্র সর্বশেষ ৩০ জুন’২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির চিত্র নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ইসলাম আফতাব কামরুল অ্যান্ড কোং-এর ম্যানেজিং পার্টনার এ কে এম কামরুল ইসলাম, এফসিএ, কোম্পানিটির আর্থিক বিবরণীর উপর শর্তসাপেক্ষ মতামত প্রদান করেছেন। খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ড্রাষ্ট্রিজ সম্পর্কে বলা হয়েছে-

মজুদপণ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা, চার বছরেও কোনো নড়াচড়া নেই

কোম্পানিটি ৫৯ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার টাকা মূল্যের মজুদ দেখিয়েছে। এর মধ্যে কাঁচামালবাবদ ৫৫ কোটি ৩৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা, মজুদপণ্যবাবদ ৪ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আর স্টোর সামগ্রীতে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। তবে তথ্য বলছে, এই মজুদের হিসাব ২০২১ সাল থেকে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ চার বছর ধরে একই পরিমাণ মজুদ দেখানো হলেও তার কোনো বাস্তব নড়াচড়ার তথ্য নেই।

নিরীক্ষক জানায়, সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো কোম্পানির কাছে মজুদের কোনো রেজিস্টার বা সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে প্রকৃত মজুদের পরিমাণ বা মূল্য যাচাই করতে পারেননি। পাশাপাশি একই কারখানা চত্তরে একটি তাদেরই একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করায় মজুদের প্রকৃত মালিকানা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে আর্থিক বিবরণীতে দেখানো মজুদ আদৌ কোম্পানির নিজস্ব কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রপ্তানি বিল পাওনা, পাঁচ বছরেও আদায় হয়নি এক টাকা!

কোম্পানির আর্থিক হিসাবে ৬ কোটি ২২ লাখ টাকা রপ্তানি বিল পাওনা দেখানো হয়েছে, যা ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। এত দীর্ঘ সময়েও এই পাওনা আদায়ের কোনো অগ্রগতি নেই এবং সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য কোনো প্রভিশনও রাখা হয়নি। এতে করে এই পরিমাণ অর্থ আদায়ের বিষয়ে ব্যবস্থাপনা গত কয়েক বছরের কোনো যোগাযোগপত্র, দাবির নথি দেখাতে পারেনি।

ফলে কোম্পানির এই পাওনা আসলেই আদায়যোগ্য কিনা, তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এছাড়া ‘ট্রেড অ্যান্ড আদার রিসিভেবলস’ হিসেবে আরেকটি সিস্টার কনসার্নের (সহযোগী প্রতিষ্ঠান) কাছ থেকে ৪ কোটি ৫১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৪ টাকা পাওনা দেখানো হয়েছে। ফলে মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৭৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।

কেলেঙ্কারি প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি টাকার এফডিআর

কোম্পানিটির কাছে ৩ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত এবং কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক হিসাবমান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোটিং স্টান্ডাড (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী, এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো অবমূল্যায়ন প্রভিশন রাখা হয়নি। ফলে আরো উদ্বেগ বাড়ার বিষয় হলো, এই এফডিআরের উপর ২১ জুলাই ২০১৯ সাল থেকে কোনো সুদ হিসাবভুক্ত করা হয়নি। ফলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে।

কর ও ভ্যাট পরিশোধে অনিয়ম

প্রতিবেদনে কোম্পানির হিসাব সংক্রান্ত কর ও ভ্যাটে একাধিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সাব-কন্ট্রাক্ট থেকে প্রাপ্ত আয়ের উপর কোম্পানিটি ভ্যাট এবং এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (অগ্রিম আয়কর) পরিশোধ করেনি। এতে করে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আর্থিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ৭৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা উৎসে কর (উইথহোল্ডিং ট্যাক্স) পরিশোধ করা হয়নি। নিরীক্ষা আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির কোনো আয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে সব ধরনের আয় এসেছে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাব-কন্ট্রাক্ট থেকে, যা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।

সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর নির্ভরশীলতা

খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের নিজস্ব তহবিল থেকে অনেক ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়নি। কারখানার ওভারহেড, মজুরি ও বেতন ৫ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ৮০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এই ব্যয়গুলো সহযোগী প্রতিষ্ঠান নগদে পরিশোধ করেছে। ফলে কোম্পানিটির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

চার বছর ধরে মজুদপণ্যের নড়াচড়া না হওয়া, স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার না থাকা, রপ্তানি বিল পাঁচ বছরের আদায় না হওয়া, পিপলস লিজিংয়ে বিনিয়োগ ঝুঁকি ও কর ও ভ্যাটের অনিয়ম বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খান বলেন, আথিক হিসাব প্রতিবেদন নিয়ে নিরীক্ষক যে স্টেটমেন্ট দিয়েছে সে বিষয়গুলো আগের মতোই অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও (ডিএসই) হিসাব যাচাই-বাছাই করেছে, এতে তারাও গুরুতর কিছু পাইনি।

তোফায়েল কবির খান সহযোগী কোম্পানির আয়ের ওপর সমসাময়িক নিরভরশীল জানিয়ে বলেন, আমাদের কোম্পানির বিদেশে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে অনেক ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়নি। যে কারণে সহযোগী কোম্পানির সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। ফলে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন-ভাতা অন্যান্য ব্যয়গুলো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে।

চলমান কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর শঙ্কা

এদিকে খান ব্রাদার্স কোম্পানিটি তীব্র কার্যকরী মূলধন সংকটে ভুগছে এবং পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাব-কন্ট্রাক্টের (উপচুক্তি) উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির চলমান প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকার চলমান কার্যক্রম সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

হিসাবরক্ষণে বড় ধরনের অনিয়ম

কোম্পানির আর্থিক হিসাবে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ধারা ১৮১ অনুযায়ী যথাযথ হিসাববই সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। কিন্তু কোনো সম্পদ রেজিস্টার নেই, কোনো শনাক্তকরণ নম্বরও নেই। ফলে সম্পদগুলোর প্রকৃত অস্তিত্ব ও মূল্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া কোম্পানির নগদ ও নগদ সমতুল্য মোট ৬ কোটি ১৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে হাতে নগদ ২২ লাখ ৫ হাজার ৭৫২ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ১৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা এফডিআর, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যমুনা ব্যাংকে ২০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং পিপলস লিজিংয়ে ৩ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এফডিআরে।

খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কোম্পানির এসব বিষয়গুলো আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখবো। এক্ষেত্রে যদি কোনো অসঙ্গতি হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খান ব্রাদার্সের পিপি ওভেন ব্যাগ ১০ কোটি ২৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা টোল রাজস্ব হয়েছে। এরমধ্যে থেকে টোল রাজস্ব ব্যয়, পরিচালন, প্রশাসনিক, সুদজনিত ও কর ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ৬৮২ টাকা, আর এতে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে ০.২৭ টাকা। যা এরআগের হিসাববছরে একইসময়ে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছিল ৮ লাখ দুই হাজার ৬১২ টাকা, ইপিএস হয়েছিল ০.০১ টাকা। অন্যদিকে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদ রয়েছে ১২.০৭ টাকা।

উল্লেখ্য, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাষ্ট্রিজ ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি হয়। কোম্পানিটির ১৫০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। কোম্পানিটি ২০১৮ অর্থবছর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। আর সর্বশেষ অথবছরে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। মোট ৯ কোটি ৮০ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭টি শেয়ারের মধ্যে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের কাছে ৩০.১৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিকদের কাছে ১২.৮৩ শতাংশ, বিদেশীদের হাতে ০.১৫ শতাংশ এবং সাধারন বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৬.৮৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)