সিনিয়র রিপোর্টার: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়ার পাঁচ বছর পর জানা গেল বস্ত্র খাতের কোম্পানি নূরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটার লিমিটেড যে তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে টাকা তুলেছিল, তাতে সত্য গোপন করা হয়।
২০১৭ সালে কোম্পানিটিকে ৪ কোটি ৩০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ৪৩ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। সে সময় কোম্পানিটি যে নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব জমা দেয়, তাতে অনেক নয়ছয়ের প্রমাণ মিলেছে পরে।
মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ এনে এখন মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-ডিএসই ও বিএসইসির নিজস্ব তদন্তে উঠে আসে অনিয়মের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন কোম্পানির আইপিও ইস্যু ম্যানেজার, স্ট্যাচুটরি অডিটর ও আইপিও ফান্ড ইউটিলাইজেশন অডিটর। তাদের সবাইকেই মামলার আসামি করা হচ্ছে।
বুধবার বিএসইসির ৮৪০তম কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সংস্থাটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।


কেবল আইপিও অনুমোদনের সময় মিথ্যা তথ্য নয়, টাকা তুলে গোপনে কোম্পানিও বন্ধ করে দিয়েছেন কোম্পানির পরিচালকরা। এ বিষয়টি জানতে পেরে এক বছর আগে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করে দেয় বিএসইসি। নতুন পর্ষদও এই কোম্পানিকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে পারেনি।
নূরানী আইপিওতে শেয়ার ১০ টাকা দরে বিক্রি করলেও পরে একপর্যায়ে তা ছাড়িয়ে যায় ৩০ টাকা। আর উদ্যোক্তা পরিচালকরা আরও ৪ কোটি টাকার বেশি শেয়ার বিক্রি করেন। যদি গড়ে ২৫ টাকাতেও বিক্রি করা হয়, তাহলে তারা আয় করেছেন শতকোটি টাকা।
কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১২২ কোটি টাকার বেশি, শেয়ারসংখ্যা ১৩ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৩০। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৯৩ শতাংশ আছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। বাকি ৮ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার ১০৮টি শেয়ারের মধ্যে সিংহভাগই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬ কোটি ৩৫ লাখের বেশি আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ২ কোটি ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৫টি শেয়ার।
অর্থাৎ নূরানীতে বিনিয়োগ করে ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি যে লোকসান করেছেন সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
আবার উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বিও হিসাবে যে ৩০ দশমিক ৯৩ শতাংশ শেয়ার আছে, সেটি আবার যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের কাছে জামানত হিসেবে জমা দিয়ে মার্জিন ঋণ নেয়া হয়। এই শেয়ারের বিপরীতে প্রাপ্ত মার্জিন ঋণও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
ফলে কোম্পানিটির মালিকপক্ষ আসলে তাদের হাতের সব শেয়ারই কার্যত বিক্রি করে দিয়েছেন। এমনকি কোম্পানিটির ওয়েবসাইটও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এখন ১০ টাকার অভিহিত মূল্যের এই শেয়ারের দর নেমে এসেছে ৭ টাকায়।
সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে কোম্পানিকে টাকা তোলার অনুমতি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যে ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে, তার দায় বিএসইসি নেবে কি না, এমন প্রশ্নে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম কোনো জবাব দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আপনি আমার বক্তব্য নো কমেন্টস লিখে দেন।
নূরানী ডায়িং ২০১৬ ও ২০১৭ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও প্রকাশিত প্রসপেক্টাস অনুযায়ী এবি ব্যাংকের কাছে কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক দায় যথাক্রমে ৫৭ কোটি ২০ লাখ ও ৪২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা উল্লেখ ছিল।
কিন্তু পরিদর্শক ও তদন্ত কমিটির তদন্তে দেখা যায়, ২০১৮ সালে প্রকৃত ব্যাংক দায়ের পরিমাণ ১৬৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরের বছর তা হবে ১৯২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ২১৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন করা হয়। যার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) চাঁদা অংশগ্রহণকারীরা বিভ্রান্তিকর তথ্য পেয়ে প্রতারিত হন।
কোম্পানিটি ২০১৭ সালে আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলিত ৪৩ কোটি টাকা বিভিন্ন কারসাজি স্কিম বা ডিভাইসের মাধ্যমে, যেমন ব্যাংক বিবরণী জালিয়াতি, মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্টের (এমটিডিআর) নগদায়ন এবং কোনো প্রকার কাজ বা পরিষেবা ছাড়াই স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে (সিস্টার কনসার্ন) ৪১ কোটি ১৪ লাখ টাকা দেয়। এতে কমিশনের আইপিও অনুমোদনের শর্তও ভঙ্গ হয়।
২০১৭ সালে আইপিও ইস্যুকালীন স্ট্যাচুটরি অডিটর হিসেবে দায়িপ্রাপ্ত অডিট ফার্ম কর্তৃক আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর এ-সংক্রান্ত ‘ক্লিন রিপোর্ট’ (আনকোয়ালিফাইড অপিনিয়ন) দেয়া হয়।

২০১৯ ও ২০২০ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ইস্যুয়ার কোম্পানি কর্তৃক প্রকাশিত হিসাব বিবরণীর রপ্তানি আয়, বিক্রয় ও দেনাদারের সপক্ষে বিভিন্ন প্রমাণপত্র, যেমন- পিআরসি, টিডিএস সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইত্যাদি কাগজপত্র জালিয়াতি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওই সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় বলে মনে করছে ডিএসই ও বিএসইসি।
এই সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত অডিটরদের মাধ্যমে ক্লিন রিপোর্ট প্রদান করে ওই আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়। ওই সময়ে কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তা জানানো হয়নি বিনিয়োগকারীদের।
© দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- ২০২৩
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৯৯, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: +৮৮০ ১৭৯৭-৬১১৯৬১, +৮৮০ ৯৬৩৮ ৯৩৫৭৩৬
ইমেইল: info@dailystockbd.com (যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম মুঠোফোন)