শাহীনুর ইসলাম: আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শুদ্ধাচার ফেরাতে চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত ও ব্যাংকিং নীতির পরিপন্থি ২০২৩ সালের বৈষম্যের প্রজ্ঞাপন জিইয়ে রেখেছে, যাকে লুটের পথ প্রশস্ত রেখে ব্যাংক খাতে শুদ্ধাচার ফেরানোর অপচেষ্টা বলছেন ব্যাংক নির্বাহীরা, যা নিয়ে সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক পিএলসিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা ও নির্বাহীদের মনে অসন্তোষের ঝড় বইছে।
২০২৩ সালের বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন অনুসারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত প্রশাসন পরিচালনা করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়োগ দিলেও তার ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। ব্যাংকে কর্মকর্তা নিয়োগ দিচ্ছে ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট; অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ব্যাংকে পদায়ন ও পদোন্নতি দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আর্থিক বিভাগ। একই সেক্টরে দুটি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া, যা ব্যাংকিং আইনে সাংঘর্ষিক, যা ২০২৩ সালের আগে ছিল না।

অন্যদিকে, গেজেট অনুসারে ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন পদে চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে দাঁড় করিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এ কারণে ২০২৩ সালে গঠিত শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাপন বাতিল চান ব্যাংক নির্বাহীরা। তাদের অভিযোগ, লুটের পথ প্রশস্ত রেখে ব্যাংক খাতে শুদ্ধাচার ফেরাতে সংস্কার করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে গত সোমবার ও মঙ্গলবার সকালে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে জনতা ব্যাংক পরিবার। রাজধানীর মতিঝিলে জনতা ব্যাংক ভবনের সামনে থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রজ্ঞাপন বাতিল করার আহ্বান জানান তারা। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা না হলে বৃহৎ কর্মসূচি ঘোষণার কথাও বলেন।
একই দাবিতে গত সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে আবেদন করেন জনতা ব্যাংক নির্বাহীরা।
জনতা ব্যাংক নির্বাহীদের দাবি, ‘আগে প্রজ্ঞাপন বাতিল চাই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। অন্য ব্যাংক থেকে জনতা ব্যাংকে পদায়ন চলবে না। চুক্তিভিত্তিক সব নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। আমাদের অনেক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হোক।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটির আওতায় ১৯৯৮ সালে একটি বৃহৎ ব্যাচ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেন। যোগদানের সময় মেধাভিত্তিক প্রার্থীরা যথাক্রমে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে নিয়োগ পান। সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকে একই সময়ে যোগদান করা কর্মকর্তারা একজনও জিএম পদে পদোন্নতির সুযোগ পাননি। তবে ২০০৫-০৬ সালে রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়।

তাদের অভিযোগ, বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের ১৯৯৮ সালের কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন এমডি, ১৫ জন ডিএমডি এবং অধিকাংশ জিএম পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এমনকি ২০০৪ সালে যোগদান করা কর্মকর্তারাও জিএম হিসেবে পদোন্নতি পান।
তাদের মধ্যে ১৯৯৮ সালের ব্যাচ হিসেবে গত ১১ নভেম্বর জনতা ব্যাংকে মজিবুর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগদান করেন। এমডি, সিএফও, কোম্পানি সেক্রেটারিসহ সাতজন জনতা ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। মেয়াদ শেষে ফের চুক্তিভিত্তিক কোম্পানি সচিব পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন এম এইচ এম জাহাঙ্গীর, যাকে ঘিরে প্রবল আপত্তি ব্যাংক নির্বাহীদের।
অন্যদিকে সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকে ১৯৯৩, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে যোগদান করা কর্মকর্তারা এখনো এজিএম, ডিজিএম এবং সর্বোচ্চ জিএম পদে কর্মরত আছেন। নতুন গেজেটের ফলে রূপালী ব্যাংকের জুনিয়ররা অন্য ব্যাংকে সিনিয়র পদে পদায়িত হচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব হওয়ায় কাজের পরিবেশ সাংঘাতিকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ব্যাবসায়িক দিক থেকে ব্যাংকিং সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈষম্যমূলক পদোন্নতির নীতিমালা সংশোধন ও বাতিলের প্রতিকার চেয়ে ইতিপূর্বে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর আবেদন করেন চার ব্যাংকের নির্বাহীরা। আমলে না নিয়ে তারা বিষয়টি অগ্রাহ্য করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, রূপালী ব্যাংকের কিছু অসাধু নির্বাহী তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রূপালী ব্যাংকের নির্বাহীদের আরও এগিয়ে নিতে বৈষম্যমূলক প্রজ্ঞাপনটি জারি করান। পরবর্তীকালে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আওয়ামী সরকারের বিতর্কিত সদ্য সাবেক গভর্নর যুক্ত হন।
বৈষম্য সৃষ্টিকারী প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন, যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গত দুই দিন সকালে জনতা ব্যাংক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। শুধু রূপালী ব্যাংককে সুবিধা দিতে অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। প্রজ্ঞাপনের কারণে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, প্রজ্ঞাপনের আওতায় একটি পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ও একটি চলমান আছে। প্রথম পদোন্নতি সম্পন্ন করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ৬ মাস সময় নিয়ে ৯ মাসেও শেষ করতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রিতার ফলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে জিএম পদে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে ও কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের নীল নকশা প্রণয়নকারী ও বৈষম্য সৃষ্টিকারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সার্ভিস রুলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি (৫৩,০০,০০০০.৩১২.২২.০০২.১৯-৩ নম্বর) প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হোক।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।