চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। গত জুলাইয়ে দেওয়া পূর্বাভাসে এ হার ছিল ৩ শতাংশ। তবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ালেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব কমিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। গত এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। সেই হিসাবে সংস্থাটি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে চলতি বছরের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বিনিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতির কয়েকটি দেশ এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশগুলো সুবিধা পাচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সরকারি ঋণের চাপ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের সরবরাহে বিঘ্ন এবং সরকারি ঋণের উচ্চমাত্রা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। তবে যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এ পূর্বাভাস বদলে যেতে পারে।
সংস্থাটির ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারে থাকলে ওই বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমে আসবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআই খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল না এলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তিটির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে শেয়ারবাজার, ভোগব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও বিনিয়োগ বাড়লে ২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি আরও শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বাড়তে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাসে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ইউরোজোনের অর্থনীতি ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে। চীনের অর্থনীতিতে চলতি বছর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতি দুই বছরই ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি জ্বালানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনীতি চলতি বছর ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের মতে, ঋণের চাপ বাড়লে সরকারগুলোর নতুন সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে ঋণের সুদ ব্যয় বাড়লে উন্নয়ন ও জনসেবায় ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই করা, মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে, এআই খাতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করলেও যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণের চাপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।