সকল মেনু

আইপিও ফান্ডের ১২ কোটি টাকা ব্যবহারের অনুমতি পায়নি রিং শাইন

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতে কোম্পানি রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সংগৃহীত ১২ কোটি টাকা ব্যবহার করার অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কাছে করা আবেদন বাতিল করা হয়েছে। রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, রিং সাইন কর্তৃপক্ষ গত ১৯ ডিসেম্বর বিএসইসির কাছে আইপিও ফান্ডের ১০ লাখ ডলার বা ১২১ টাকা প্রতি ডলার হিসাবে ১২ কোটি কিছু বেশি টাকা ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। তবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে কোম্পানিটির ওই আবেদন বাতিল করে দিয়েছে বিএসইসি।

এর আগে গত ১৪ জুলাই পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ১০ টাকা মূল্যের ২৭ কোটি ৫১ লাখ ৪ হাজার ৮২০টি শেয়ার ইস্যু করে মোট ২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে। কোম্পানিটি তার পরিশোধিত মূলধন ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা থেকে ২৮৫ কোটি ০৫ লাখ টাকায় উন্নীত করে।

পরবর্তী সময়ে অর্থ জমা ছাড়া প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু বা বরাদ্দের মাধ্যমে ২৭৫ কোটি টাকার মূলধন বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধ আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠে এবং এ বিষয়ে তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন আইনি প্রক্রিয়ায় শুনানি শেষে রিং শাইন টেক্সটাইলের প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইপিও প্রসপেক্টাসে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সরবরাহ করার কারণে রিং সাইন টেক্সটাইলসের উদ্যোক্তা, তৎকালীন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালকসহ মোট ৯ জন এবং কোম্পানিটির তৎকালীন সিএফও, কোম্পানি সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত সংঘবদ্ধ আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ইস্যু ম্যানেজারের পরিবর্তে আব্দুল কাদের ফারুকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংঘটিত রিং শাইন টেক্সটাইলসের শেয়ার প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিবের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও বিষয়টি দুদকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ছাড়া রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড ওই উদ্যোক্তা বা তৎকালীন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, সিএফও, কোম্পানি সচিবসহ সংশ্লিষ্ট আব্দুল কাদের ফারুক, অশোক কুমার চিরিমারসহ (ভারতীয় নাগরিক) মোট ১৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।

বিএসইসির সর্বশেষ কমিশন সভায় রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডের ২০২০ সালসহ বিগত পাঁচ বছরের মিথ্যা ও বানোয়াট আর্থিকবিবরণী প্রত্যয়ন করায় সংশ্লিষ্ট চারটি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান (আহমেদ ও আখতার, সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং, মাহফেল হক অ্যান্ড কোং এবং এটিএ খান অ্যান্ড কোং) এবং তাদের পার্টনারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

কমিশন সভায়, রিং সাইন টেক্সটাইলসের বহিরাগত প্লেসমেন্টহোল্ডাররা, যারা কোম্পানির হিসাবে অর্থ জমা না দিয়ে অথবা আংশিক জমা দিয়ে তাদের নামে শেয়ার বরাদ্দ নেওয়ার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, এমন প্লেসমেন্টহোল্ডারদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুদকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রিং সাইন টেক্সটাইলসের শেয়ার প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত যে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছিল, তার মূলহোতা হিসেবে দায়ী আব্দুল কাদের ফারুক এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসাবে অশোক কুমার চিরিমারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুদকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগের ২৪ জুন ২০২১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির সন্ধান পায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। সে সময় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানিয়েছিল, আইপিওতে আসার আগের বছর কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৮৫ কোটি ০৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। এর মধ্যে সব উদ্যোক্তা এবং ৩৩ বাংলাদেশি টাকা ছাড়াই জালিয়াতি করে শেয়ার নিয়েছেন। তবে তার মোট পরিমাণ কত, তা জানায়নি সংস্থাটি।

বিএসইসি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০১৮ সালে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি দেখিয়ে ২৭৫ কোটি ০৫ লাখ টাকার মূলধন বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে ১১ উদ্যোক্তা-পরিচালক (প্রকৃতপক্ষে ৯ উদ্যোক্তা এবং স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠান) এবং ৭৩ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি দেখানো হয়।

কিন্তু ১১ উদ্যোক্তা এবং ৩৩ বাংলাদেশি শেয়ারহোল্ডার এই শেয়ার নিতে নগদ মূল্য পরিশোধ করেছেন বলে আইপিও প্রসপেক্টাসে তথ্য দিয়েছেন। আসলে তারা কোনো টাকাই পরিশোধ করেননি। শেয়ার জালিয়াতির এ তথ্য ২০২১ সালের ২০ মে প্রথম প্রকাশ করেছিল বিএসইসি। ওইদিনও সংস্থাটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, কমিশন সভায় আইপিও পূর্ব শেয়ারের মধ্যে টাকা ছাড়াই যতগুলো শেয়ার ইস্যু করা হয়েছিল, তার সবটাই বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রিং শাইন কোম্পানিটি আইপিওতে আসার আগের বছরে ৭৩ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ১১৪ কোটি টাকার প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি দেখানো হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, এর মধ্যে ৩৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই জালিয়াতি করে শেয়ার নিয়েছেন।
আইপিওর আগে রিং শাইন টেক্সটাইলের পরিশোধিত মূলধন ছিল ২৮৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালক এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল ১৭১ কোটি টাকা।

আইপিও প্রক্রিয়ায় ১৫০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে তালিকাভুক্ত হলে এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৫ কোটি টাকা। তালিকাভুক্তির পর ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিলে তা বেড়ে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

রিং শাইনের আইপিও প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির চেয়ারম্যান সুং জে মিন, এমডি সুং ওয়ে মিনসহ ৯ উদ্যোক্তার শেয়ারমূল্য ছিল অভিহিতমূল্যে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। আইপিওতে আসার আগের বছর যা বেড়ে ১৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ছাড়ায়। অর্থাৎ ১৩৪ কোটি টাকার শেয়ারই জালিয়াতি করে নিয়েছেন।

সে সময় বিএসইসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, এ জালিয়াতির কারণে ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন হয়নি। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। শেয়ার জালিয়াতির এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও শেয়ারবাজার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যদিও কোম্পানিটিকে একবার তাদের আইপিও ফান্ডের টাকা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ৭৭৪তম সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, আইপিও ফান্ড থেকে কোম্পানিটি শ্রমিকদের পাওনা বাবদ ১৫ কোটি টাকা, ইপিজেডের পাওনা ৩ কোটি টাকা, তিতাস গ্যাসের পাওনা সাড়ে ৩ কোটি টাকা, ব্যাংকের লোন বাবদ প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০ কোটি টাকা এবং ঢাকা ব্যাংকের ৬ কোটি টাকা এবং বিবিধ খাতে আড়াই কোটি টাকা ব্যয় করতে পারবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top