সোস্যাল মিডিয়ায় (ফেসবুক) ঘুরছে একটি ছক। কিভাবে পুঁজিবাজার থেকে টাকা লুটপাট করা যায়- সেই পরিকল্পণার চিত্র। নাজমুন নাহার মৌসুমী লিখেছেন সেই পরিকল্পণার কথা। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার বিচিত্র একটি গবেষণাপত্র তুলে ধরা হলো-
আমার ১ কোটি টাকা আছে। ব্যাংক থেকে আরো ১ কোটি টাকা লোন নিয়ে ২ কোটি টাকায় একটা বিস্কুট কোম্পানি বানালাম। নাম দিলাম ABC Limited. এবার একটা মার্চেন্ট ব্যাংকে গেলাম- সোনালী ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংক। ব্যাংকের হেড অফ অপারেশনকে বললাম, আমার বিস্কুট কোম্পানি ABC Limited কে স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড করতে চাই। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম হচ্ছে- মিনিমাম ৪০ কোটি টাকার নিচের কোন পেইড-আপ ক্যাপিটালের কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা যায় না। কিন্তু আমার কোম্পানি মাত্র ২ কোটি টাকার!
মার্চেন্ট ব্যাংকের হেড অফ অপারেশন বললেন, ‘সমস্যা নাই ভাই। আপনার কোম্পানি আমরা লিস্টেড করে দিবো। কিন্তু শর্ত হচ্ছে- আমাকে ৮ কোটি টাকা দিবেন। আমি কষ্ট করবো, পারিশ্রমিক হিসাবে আলাদা আরো ২ কোটি দিবেন। এটা আবার ব্যাংক যেন না জানে; মোট ১০ কোটি দেবেন’।
জবাব দিলাম, ‘আমি কিভাবে ১০ কোটি টাকা দিবো।’
মার্চেন্ট ব্যাংকের হেড অফ অপারেশন বললেন, ‘পকেট থেকে এক টাকাও দিতে হবে না। আমরা মার্কেট থেকে আপনাকে টাকা তুলে দিবো। আপনি ওখান থেকে ১০ কোটি টাকা দিবেন। আপনি ৫০ পার্সেন্ট শেয়ার বিক্রি করবেন; আর বাকি ৫০ পার্সেন্ট শেয়ার নিজের কাছে রাখবেন।’
শর্তে রাজি হলাম। এবার মার্চেন্ট ব্যাংকের হেড অফ অপারেশন অডিট ফার্মে গেলো। গিয়ে বললো, ABC Limited স্টক এক্সচেঞ্জ এ লিস্টেড করবো।
অডিট ফার্ম বললো, ‘কি করতে হবে শুধু হুকুম করেন।’ হেড অফ অপারেশন বললেন, ‘বেশি কিছু না, কেবল ২ কোটি টাকার কোম্পানিকে ৪০ কোটি টাকা ভ্যালুয়েশন করে দেখাতে হবে।’ অডিট ফার্ম বললো, ‘কোনো সমস্যা নাই। তবে বস, এবার একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। স্টাফদের স্যালারি দিয়ে মাস শেষে লোকসান হচ্ছে। এবার ২ কোটি টাকার নিচে পারবো না।’
শেষ পর্যন্ত নেগোসিয়েশন করে ১ কোটি টাকায় রাজি হলো ২ জন। এবার হেড অফ অপারেশন সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন চেয়ারম্যানের পিওনকে ফোন দিল (পিওন ভেবে অর্ডিনারি পিওন ভাবার সুযোগ নাই, এই পিওন বাকি ১০০টা পিওনের মতো অর্ডিনারি পিওন নয়।
পিওনকে বল্ল, নতুন একটা বিস্কুট কোম্পানি মার্কেটে লিস্টেড করতে হবে, কাজটা করে দিতে হবে। পিওন বললো, ‘স্যার কিন্তু এখন ২.২০ কোটি টাকার নিচে কোনো কাজ পাশ করে না। এর নিচে কাজ হবে না, আর জিনিসপাতির দাম বাড়ছে, বউ বাচ্চা নিয়ে না খাওয়ার অবস্থা। মেয়েটার ভার্সিটির বেতন বাকি পড়ছে, আমার দিক একটু দেইখেন।’
হেড অফ অপারেশন বললো, ‘ওকে ডিল ফাইনাল কাজ করে দেন।’ হেড অফ অপারেশন এবার স্টক এক্সচেঞ্জ -এর টপ লেভেলে যোগাযোগ করলো। বলল, ‘এই বিস্কুট কোম্পানি অপ্প্রভ করে দিতে হবে।’ স্টক এক্সচেঞ্জ বললো, ‘ঠিক আছে কিন্তু ২ কোটি টাকা নিব, এর নিচে হবে না।’ ডিল ফাইনাল হল।
এবার ২ কোটি টাকার বিস্কুট কোম্পানিকে ৪০ কোটি টাকা দেখিয়ে আইপিওর জন্য আবেদন হলো। ৫০ পার্সেন্ট শেয়ার মানে ২০ কোটি টাকার শেয়ার মার্কেটে ছাড়া হলো। প্রিমিয়াম প্রাইস ৫ টাকা যোগ করে ৩০ কোটি টাকা। মানে ১ কোটি টাকার অরিজিনাল শেয়ার বিক্রি করে মার্কেট থেকে তোলা হলো ৩০ কোটি টাকা। এবার আমি আমার কথা মতো ১০ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংকের হেড অফ অপারেশনকে বুঝিয়ে দিলাম। আর বাকি টাকা আমার, মানে আমার পকেটে ঢুকলো ২০ কোটি টাকা।
হেড অফ অপারেশন স্টক এক্সচেঞ্জকে ২ কোটি টাকা দিলো। আর স্টক এক্সচেঞ্জ -এ যারা আছে তারা ২ কোটি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিলো। অডিট ফার্মকে দিলো- আরো ১ কোটি টাকা। আর বাকি টাকা সোনালী ব্যাংক -এর কমিশন হিসাবে নিলো।
নিজের জন্য বাকি টাকা। আর ২.২০ কোটি টাকা দিলো সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানের পিওনকে। সাথে পিওনের মেয়ের ভার্সিটির বকেয়া বেতন বাবদ দিলে আরো ১০ লাখ টাকা।
পিওন তার স্যারকে বলল, ‘স্যার, দুনিয়ায় এখন আর মানুষ নাই; সব অমানুষ হয়ে গেছে। আমাকে বলছিলো ২ কোটি টাকা দিবে কিন্তু ২০ লক্ষ টাকা কম দিছে। আমারে বলছিলো কিছু টাকা দিবে, একটা টাকাও দিলো না স্যার।’
সে তার স্যারকে ১.৮০ কোটি টাকা দিলো। স্যার পিওনকে ২ লাখ টাকা দিয়ে নিজের কাছে ১ কোটি টাকা রেখে বাকি টাকা কয়েকটা খামে ভরে তার কলিগদেরকে পাঠিয়ে দিলো। অনিয়ম আর কারসাজির প্রথম স্টেজ শেষ।
এবার দ্বিতীয় পর্ব: ABC Limited মার্কেটে লিস্টেড হলো। আর আইপিও প্রাইস হলো ১৫ টাকা। ট্রেড শুরু হলো- একটা ১৫ টাকার শেয়ার পাবলিক ৫০ টাকা করে বাই করলো। আমার তো মাথা খারাপ, আমার বাকি অরিজিনাল ১ কোটি টাকার শেয়ারের মার্কেট ভ্যালু ১০০ কোটি টাকা।
অলরেডি ২০ কোটি টাকা পকেটে ঢুকাইছি। এবার আমি আমার বাকি ৫০ পার্সেন্ট শেয়ার ও বিক্রি করা শুরু করলাম। কিন্তু এতো শেয়ার বিক্রি করবো, পাবলিক তো খাবে না! তাই একাউন্টেন্টকে বললাম, ‘লাস্ট ৩ মাসের আর্নিং দেখাও ২.৪০ কোটি টাকা লাভ।’
একাউন্টেন্ট বললো, ‘স্যার, সারা বছর কোম্পানি লাভ করে ১.২০ কোটি টাকা। আর ৩ মাসে কিভাবে ২.৪০ কোটি টাকা লাভ দেখাবো?’ জবাব দিলাম, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে কি নকল করে পাশ করছো? ৩ মাসে লাভ দেখাবা ২.৪০ কোটি টাকা, এরপরের ৯ মাসের আর্নিং ১.২০ কোটি টাকা লস দেখিয়ে এডজাস্ট করে দিবা, সোজা হিসাব।’
মাত্র ১ পিস্ শেয়ার মানে ১০ টাকার একটা শেয়ার কেবল নিজের কাছে রাখলাম, বাকি সব শেয়ার বিক্রি করে দিলাম। নিজের পকেটে ঢুকলাম আরো ১০০ কোটি। পাবলিকের থেকে খাওয়ার আর কিছু নাই।
এবার কোম্পানি ফোকাস করা শুরু করলাম, ABC Limited প্রতি বছর ১ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রফিট করেছে। আমি কোম্পানির এমডি. হিসাবে নিজের স্যালাারি/রেমুনারেশন ধরলাম ৪০ লাখ টাকা। বৌ কে বানালাম চেয়ারম্যান, বউয়ের স্যালারি/রেমুনারেশন ধরলাম ৫০ লাখ, ছেলে-মেয়ে ২টা আছে। তাদের আরো ২টা পোস্ট দিয়ে ওদের স্যালারি/রেমুনারেশন ধরলাম ১০ লাখ, টোটাল ১ কোটি টাকা আমার ফ্যামিলি স্যালারি/রেমুনারেশন বাবদ নেয়া শুরু করলাম। ABC বিস্কুট কোম্পানির আরো ২০ লাখ টাকা লাভ বাকি আছে- এটা কিভাবে নেয়া যায়!
কোম্পানির জন্য কষ্ট করতেছি, কোম্পানি আমাকে বাড়ি ভাড়া দিবে না? নিজের বাড়িতে থাকি তো কি হইসে! অন্য কোথাও থাকলে তো ভাড়া দিতে হতো! কোম্পানি থেকে বছরে ১০ লাখ টাকা বাড়ি ভাড়া বাবদ চার্জ করলাম। আমার ড্রাইভার কত কষ্ট করে। ড্রাইভারের বেতন ৫ লাখ, গাড়ির তেল খরচ আরো হাবিজাবি খরচ কে দিবে! আরো ৫ লাখ টাকা। বাসায় থাকলেই হবে, খাওয়া-দাওয়া করতে হবে, বাজার খরচ, কাজের বুয়ার বেতন, গ্যাস বিল পানির বিল, ইলেকট্রিসিটি বিল কে দেবে! তার জন্য ৫ লাখ টাকা।
এলাকার ছেলেরা ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে। আমি প্রধান অতিথি চাঁদা দিতে হবে। সোশ্যাল ওয়ার্ক বাবদ আরো ৫ লক্ষ টাকা। আরো কিছু মিলে কোম্পানি থেকে বিল করে নেই। স্যালারি নেয়ার পর খরচ দাঁড়ালো আরো ৮০ লাখ টাকা। ABC Limited বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রফিট করছে। সব খরচ বাদে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা মানে কোম্পানির উল্টো লোকসান এখন ৬০ লাখ টাকা।
এবার তৃতীয় স্টেজ: স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন মাসে-মাসে ফি দেব! যা পারে করুক। ৬ মাস পর স্টক এক্সচেঞ্জ ABC Limited কে ডিলিস্টেড করে দিলো। এবার দেখলাম আগের মতো আর বিস্কুট বিক্রি হয় না। প্রফিট খুব কম। ভাবলাম, ২ কোটি টাকার কোম্পানি ১.৫ কোটি টাকায় বিক্রি করি।
বিক্রি করতে যাবো, কোম্পানির ম্যানেজার বললো, ‘স্যার আপনার তো কোনো শেয়ার নাই, সব তো পাবলিকের কাছে বিক্রি করে দিছেন। তাহলে আপনি কোম্পানি বিক্রি করবেন কিভাবে? আর ব্যাংক আপনার কাছে ১ কোটি টাকা পায়।’
জবাব দিলাম, ‘আরে ধুর- এইটা বাংলাদেশ। ওই ১ কোটি টাকা ব্যাংককে আজীবন বাকির খাতায় লিখে রাখতে বল। আর পাবলিক! পাবলিক কোর্টে দৌড়াবে। রায় আসতে-আসতে তাদের নাতি-পুতিও দুনিয়া থেকে চলে যাবে। বুঝ নাই ব্যাপারটা?’
এভাবেই দরবেশরা হাতিয়ে নিয়েছে হাজার-হাজার কোটি টাকা। আমরা হারিয়েছি সর্বস্ব। কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।