লভ্যাংশ প্রদানের ঘোষণা দিয়েও ১৭টি কোম্পানি এখনো বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক হিসাবে লভ্যাংশ জমা দেয়নি। বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুমোদন এবং প্রদানের নির্ধারিত সময় ৮ মাস আগে পার হলেও কোম্পানিগুলো প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে, কোম্পানিগুলোর অবন্টিত মোট টাকার পরিমাণ প্রায় ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। মুল মার্কেটের ১১টি কোম্পানির ৬৫ কোটি ৪৮ লাখ এবং এসএম খাতের ৬ কোম্পানি ৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা অবন্টিত রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে ১৭ সেপ্টেম্বর চিঠি দিয়ে জানিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সেই চিঠিতে ২১টি কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পার হলেও ইতোমধ্যে চারটি কোম্পানি তার লভ্যাংশ জমা দিয়েছে।
কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী, এজিএমে লভ্যাংশ অনুমোদনের পর কোম্পানিকে ৩০ দিনের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের বিতরণ করতে হয়। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে লভ্যাংশ বিতরণের জন্য কোম্পানি আইন, ১৯৫৬ (এখন কোম্পানি আইন, ১৯৯৫) এবং ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ প্রযোজ্য হতে পারে।
কোম্পানি আইন, ১৯৫৬ (বর্তমানে কোম্পানি আইন, ১৯৯১) এর ধারা ১২৭-এর বিধান অনুযায়ী, লভ্যাংশ ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
গত এপ্রিল মাসে ব্যর্থ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিএসইসি বৈঠক করে। বৈঠকের পর পাঁচ মাস পার হলেও এখনো লভ্যাংশ বিতরণ করেনি কোম্পানিগুলোর কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, ব্যর্থতার দায়ে এখন পর্যন্ত ব্যবস্থাও নেয়নি বিএসইসি।
তবে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত ১২টি কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন করা হয়েছে। যাকে কোম্পানির নয়, বিনিয়োকারীদের শাস্তি মনে করছেন অনেকে।
বিএসইসিকে দেয়া চিঠিতে ‘৩০ জুন, ২০২৪ এবং ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে সমাপ্ত বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদিত লভ্যাংশ বিতরণ না করা এবং লভ্যাংশ-পরিপালন প্রতিবেদন জমা না দেওয়া কোম্পানির তালিকা’ সম্পর্কে নিন্ত্রক সংস্থাকে জানানো হয়।
কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ হস্তান্তরের সময়সীমা সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে শেষ হয়েছে।
চিঠি অনুসারে মুল মার্কেটে ১৫ এবং এসএমইতে ৭টি কোম্পানি অবন্টিত রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরে মূল মার্কেটের আরও ৪টি কোম্পানি সব লভ্যাংশ দিয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো- আর এ কে সিরামিকস, সি পার্ল, নাভানা সিএনজি ও জেনেক্স ইনফোসিস।
তালিকা অনুসারে মুল মার্কেটের ১০টি কোম্পানি এক শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেনি।
পুঁজিবাজারে এসএমই খাতের ৩টি কোম্পানি ১ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়নি। অন্যদিকে, কৃষিবিদ ফিডের বোনাস লভ্যাংশ বিএসইসি অনুমোদন না দেয়ায় তা অবণ্টিত রয়েছে।
দেখা গেছে, মুল মার্কেটের কোম্পানি আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। মোট লভ্যাংশের মধ্যে ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে লভ্যাংশ প্রদানের সময় বিএসইসির কাছে নতুন করে বর্ধিত কয়েছে কোম্পানিটি।
লুবরেফের অনুমোদিত ১ শতাংশ লভ্যাংশের মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা অবন্টিত।
বড় কোম্পানি অরিয়ন ফার্মার ১০ শতাংশ অনুমোদিত লভ্যাংশের মোট ২৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা অপ্রদেয় রয়েছে। ফরচুন সুজের ঘোষিত ১ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এডভেন্ট ফার্মার ঘোষিত লভ্যাংশের মধ্যে ৪০ শতাংশ বা ৬৫ লাখ টাকা অপ্রদেয় রয়েছে। তার মধ্যে আরও কিছু টাকা বিনিয়োগকারীদের দেয়া হয়েছে বলে টাইসম অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন কোম্পানি সেক্রেটারি সুমন সরকার।
সাইফ পাওয়ারটেকের এজিএমে অনুমোদিত ১ শতাংশ লভ্যাংশের ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এখনো দিতে পারেনি কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায় চরম ঘাটতির কারণে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানান কোম্পানির প্রধান অর্থনীতিক (সিএফও) কর্মকর্তা হাসান রেজা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএসই প্রধান বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ১০টি কোম্পানি কোন লভ্যাংশ বিতরণ করেনি। এরমধ্যে লুব-রেফ (বাংলাদেশ), আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং, সাইফ পাওয়ার টেক, আমরা টেকনলজিস ও ফরচুন সুজ মাত্র ১ শতাংশ হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।
অপরদিকে ওরিয়ন ফার্মা ও আমরা নেটওয়ার্কস ১০ শতাংশ এবং এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ১.৭৫ শতাংশ, এস এস স্টিলস ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়েও তা কার্যকর করেনি। তবে আংশিক লভ্যাংশ বিতরণ করেছে দুটি কোম্পানি। এরমধ্যে আফতাব অটো মোবাইলস ঘোষিত লভ্যাংশের ১২.০৬ শতাংশ বিতরণ করেছে। এ কোম্পানিটি ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। এডভেন্ট ফার্মা ১ শতাংশ ঘোষিত লভ্যাংশের ৪০.২১ শতাংশ বিতরণ করেছে।
অপরদিকে এসএমই মার্কেটে তালিকাভুক্ত বিডি পেইন্টস ১২ শতাংশ, ওরাইজা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ৫ শতাংশ, মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেও কোন অর্থ দেয়নি বিনিয়োগকারীদের। হিমাদ্রি লিমিটেড ঘোষিত লভ্যাংশের ৭৭.৩৭ শতাংশ, বেঙ্গল বিস্কিটস ৬২.১৩ শতাংশ ও মাস্টারফিড এগ্রোটেক ১৪.৫৯ শতাংশ অর্থ বিতরণ করেছে।
এসএমই খাতে সবচেয়ে বেশি অবন্টিত লভ্যাংশ বিড়ি পেইন্টসের। ১০ শতাংশ হিসাবে মোট ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা এখনো বন্টক করা হয়নি।
‘শিগগিরই অবন্টিত লভ্যাংশ বন্টন করা হবে’ বলেন বিডি পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বেলাল খান।
মাস্টারফিড এগ্রোটেক তহবিল সংকটের কারণে ৬৪ লাখ টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারছে না। মোস্তফা মেটাল মোট ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা লভ্যাংশ বিতরণে আরও সময় প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেছে। বেঙ্গল বিস্কুট জানিয়েছে, ডিভিডেন্ট রিটার্নের কারণে ৪৯ লাখ টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারছে না।
লভ্যাশ প্রদানকারী আর এ কে সিরামিকসের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে বিতরণ করা হয়েছে। তবে এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের কারণে আরব আমিরাতে হোল্ডিং কোম্পানির লভ্যাংশ বিতরণ করা যায়নি।
এনবিআরের আন্দোলনের পর সে লভ্যাংশও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘বিএসইসি কোম্পানিগুলোকে ইনফোর্সমেন্টের (শাস্তি) আওতায় রেখেছে। শিগগিরই কমিশন মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানানো হবে।’
সিকিউরিজি এন্ড এক্সচেঞ্চ ১৯৯৩ আইন অনুসারে কোম্পানির জরিমানা করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, মুনাফা অবন্টিত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিশন সভায় উত্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।