সকল মেনু

রাফায়েত গ্রুপের ৮৭৭ কোটি টাকা পাচার, প্রমাণ পেয়েছে বিএফআইইউ

প্রতি পিস তৈরি পোশাক এক থেকে দেড় ডলার মূল্য দেখিয়ে রপ্তানি করা হয়েছে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। অথচ এসব পোশাকের প্রকৃত রপ্তানি মূল্য ২-১০ গুণ বেশি। কমমূল্য বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়েছে। রাফায়েত গ্রুপের এস ইসলাম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে এভাবে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৭৫ দশমিক ৭৮ লাখ ডলার রপ্তানি দেখানো হয়েছে। অথচ অনুসন্ধান বলছে, কমমূল্য দেখিয়ে প্রায় ৫৮ দশমিক ২২ লাখ থেকে ৭ দশমিক ৩০ কোটি মার্কিন ডলার পাচার করা হয়েছে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৭৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া এই গ্রুপের মালিক মো. সিরাজুল ইসলাম নিজ নামে দুবাইয়ে কোম্পানি খুলে রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই গোয়েন্দা শাখা।

রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি বিএফআইইউ থেকে এনবিআরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। শুধু অর্থ পাচার-ই নয়, রাফায়েত গ্রুপের রাফায়েত ফেব্রিক্সস লিমিটেড ও এস ইসলাম অ্যান্ড ফ্যাশন বন্ড সুবিধায় আমদানি করা অন্তত ৪ হাজার মেট্রিক টন কাপড় শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে বন্ড কমিশনারেট।

অস্বাভাবিক কম মূল্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি

বিএফআইইউর তদন্তে দেখা যায়, এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত বা দুবাইয়ে মো. সিরাজুল ইসলাম নিজ নামে খোলা মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস এলএলসিতে ২২৭টি ইএক্সপির মাধ্যমে মোট ৭৫ দশমিক ৭৮ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের গার্মেন্টস পণ্য (টি-শার্ট, প্যান্ট, ট্রাউজার ও অন্যান্য তৈরি পোশাক) রপ্তানি করেছে।

প্রতিটি পোশাকের দাম দেখানো হয়েছে সর্বনিম্ন এক ডলার থেকে সর্বোচ্চ এক দশমিক ৩০ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় ১২০ থেকে ২০০ টাকা। আবার দুবাই থেকে মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানিতেও একইভাবে রপ্তানি করেছে।
Rafayet
অনুসন্ধান বলছে, এই পোশাকের দাম ৩-৪ গুণ কম দেখানো হয়েছে। আবার কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজর এড়াতে একটি বড় চালানকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকার দেখিয়ে রপ্তানি করা হয়েছে, যাতে অর্থ পাচারের বিষয়টি নজরে না আসে।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই জায়গায়, একই জাতীয় পণ্য একাধিক ইনভয়েস ইস্যু করে রপ্তানির করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসি নামে ৮৮ হাজার ৮৭০ মার্কিন ডলার রপ্তানি করে। এর তিন দিন পর ৮১ হাজার ১৯৮ মার্কিন ডলার ইনভয়েসের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সর্বমোট ৭৫ দশমিক ৭৮ লাখ মার্কিন ডলার পণ্য রপ্তানি দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ১ দশমিক ৩৪ কোটি হতে ৮ দশমিক ৬ কোটি ডলার মূল্যমানের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।

ব্যাংকের কাছে সংরক্ষিত নথিতে দেখা যায়, বিরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২০২০ সালের ১৩ জুলাই পোশাক উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশ্যে ট্রেড লাইসেন্স (নং-২৮৮) ইস্যু করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি একই বছরের আগস্ট মাসের ৯ তারিখে ৫ লাখ টাকা প্রাথমিক জমা দিয়ে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির মহাখালী কর্পোরেট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। হিসাবটিতে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৮ দশমিক ৯৪ কোটি টাকা জমা ও সমপরিমাণ অর্থ উত্তেলন করা হয়েছে।

হিসাবটির লেনদেন বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফরেন বিল পারচেজের অর্থ জমা হওয়ার সাথে সাথে অর্থ নগদে উত্তোলণ করা হয়। গ্রাহকের চলতি হিসাবে আমদানির এলসির জন্য ব্যাংকের ঋণ, রপ্তানি বাবদ প্রত্যাবাসিত অর্থ, লোকাল বিলের অর্থ জমা হওয়ার সাথে সাথেই অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়। এক্ষেত্রে, রপ্তানির কাঁচামাল সরবরাহের বিপরীতে দায় পরিশোধের ট্রান্সফার/ক্লিয়ারিং চেক/আরটিজিএস ইত্যাদি মাধ্যম ব্যবহার না করে অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়েছে। যা অর্থের গতিপথ আড়াল করার প্রয়াস বলে মনে করছে তদন্তকারী সংস্থা।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসি’র ক্রেডিট রিপোর্টে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. সিরাজুল ইসলাম এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডেরও মালিক। অর্থাৎ, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দুটি একই ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির অপর একজন পরিচালকও বাংলাদেশি নাগরিক মাহবুব আলম।

ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট-১৯৪৭ (২০১৫ সালের সংশোধনীসহ) এর সেকশন ৪(৬) এবং সেকশন ৫ এর বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক/সরকারের অনুমোদন ব্যতিরেকে দেশের বাইরে বিনিয়োগ/ক্যাপিটাল ট্রান্সফারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অধিকন্তু, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ২ (শ) ধারা মোতাবেক বৈধভাবে উপার্জিত অর্থও নিয়ম বহির্ভুতভাবে বিদেশে প্রেরণ করা পাচার/মানিলন্ডারিং হিসেবে পরিগণিত।
Broker Khurshid Alam
বিদেশে কোম্পানি গঠন, মূলধন যোগান, ব্যবসা পরিচালনা করুর জন্য মূলধন কিভাবে প্রেরণ করা হয়েছে বা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমোদন আছে কি না তা ব্যাংকে সংরক্ষিত নথিতে পাওয়া যায়নি। এ ইউনিটের পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানটির এ সংক্রান্ত কোনো অনুমোদন নেই মর্মে পরিলক্ষিত হয়েছে। উভয় দেশে নিজের মালিকানাধীন কোম্পানির মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে তিনি অর্থ পাচারের সাথে জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। আবার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দুবাইভিত্তিক হলে তার নটিফাই পার্টি তৃতীয় একটি দেশের (মালয়েশিয়া), যা বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে রেড ফ্লাগ হিসেবে চিহিৃত। মালয়েশিয়ায় প্রচুর বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। এই শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের টাকা রপ্তানিমূল্য হিসেবে এই কোম্পানির মাধ্যমে আসতে পারে বলে ধারণা করছে তদন্ত সংস্থা।

জাহাজীকরণের চার মাসের মধ্যেও আসেনি রপ্তানিমূল্য

বিদেশি আমদানিকারকদের অনুকূলে মালামাল জাহাজীকরণের চার মাস সময় শেষ হলেও ব্যাংক কর্তৃক পণ্যের ৭৪টি রপ্তানিমূল্য আদায় করেত পারেনি। যার রপ্তানিমূল্য ৩৫ দশমিক ২৯ লাখ মার্কিন ডলার, যা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বিধিমালার লংঘন। এক্ষেত্রে, ২০২৩ সালে রপ্তানি হলেও অদ্যাবধি রপ্তানিমূল্য ফেরত আনা যায়নি।

বিদেশ থেকে প্রকৃত পাওনা দেশে না আনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ২(ক) (৩) মোতাবেক ‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’ সংক্রান্ত অপরাধ মর্মে পরিগণিত হয়। এই রপ্তানিমূল্য মো. সিরাজুল ইসলাম তার দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসির অনুকূলে রপ্তানি করা। এক্ষেত্রে বৈদেশিক আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বাণিজ্য ভিত্তিক অর্থ পাচার বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা খতিয়ে দেখছে।

বিএফআইইউ এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৭৫ দশমিক ৭৮ লাখ ডলার রপ্তানি দেখিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই রপ্তানিমূল্য ১ দশমিক ৭ গুণ হতে ১০ দশমিক ৬৪ গুণ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ পোশাক রপ্তানির আড়ালে প্রতিষ্ঠানটি ৫৮ দশমিক ২২ লাখ (প্রায় ৭০ কোটি টাকা) ডলার হতে ৭ দশমিক ৩০ কোটি ডলার (প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা) পাচার করে থাকতে পারে, যা আরো খতিয়ে দেখতে এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে।

রপ্তানি করা পোশাকের মূল্য কিভাবে পরিশোধিত হয়েছে, রপ্তানির টাকা ব্যাংক ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে দেশে এসেছে কিনা, মো. সিরাজুল ইসলাম দুবাইতে কোম্পানি কিভাবে খুলেছেন, নটিফাই পার্টি বাংলাদেশি মালিকানাধীন কিনা এবং ট্রান্সফার প্রাইসিং সংগঠিত হয়েছে কিনা- এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে এনবিআরকে অনুরোধ করেছে বিএফআইইউ।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বিউটি খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দুবাইতে সিরাজ গার্মেন্টস নামে কোম্পানি থাকলেও অর্থপাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

নি বলেন, ‘টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসছে। ব্যাংক তো জানে। শুধু সিরাজ গার্মেন্টস নয়, অন্যান্য জায়গায়ও রপ্তানি হয়েছে। আমাদের অন্যান্য বায়ার আছেন।’ কমমূল্যে রপ্তানি করে টাকা পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাচার না। আমাদের এখনো ডিউ আছে, টাকা আসতেছে।’

উল্লেখ্য, রাফায়েত গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রাফায়েত ফেব্রিক্সস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান একবছরে বন্ড সুবিধায় প্রায় ৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। প্রমাণ পাওয়ায় বন্ড কমিশনারেট ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকির মামলা করেছে।

সম্প্রতি ৩১ কন্টেইনার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে খালাস করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অপর প্রতিষ্ঠান এস ইসলাম প্রায় ২৭০ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করে বিক্রি করেছে দিয়েছে, যাতে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকির মামলা করেছে বন্ড কমিশনারেট।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top