আনন্দদায়ক রেল ভ্রমণের প্রথম শর্ত হলো— চাই টিকেট। আর সেই অনলাইন টিকেটের নামে সোনার কাঠির নিয়ন্ত্রণ এখন ‘সহজ ডটকম’ -এর হাতে। ২০২২ সালের মার্চে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তির পর এমন কোন হীনকর্ম নেই, তারা করেনি।
তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলে গঠিত কোম্পানি ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি’-এর হাতেই এখন নিয়ন্ত্রণ। বিভিন্ন উৎসবে সরকারের ই-টিকেট অবমুক্তির ১-৫দিন আগেই ব্লক রাখা হয়। দেশের প্রায় ৩ কোটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
অন্যদিকে তৈরি করা হয়েছে ‘ব্যাকডোর কালোবাজারির’ নামে ভয়ঙ্কর ফাঁদ। এমন ২২ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত বলে আইটি অডিট আপত্তিতে তুলে ধরেছে সরকারের পরিবহন অডিট অধিদপ্তর। চলতি বছরের ১৬ আগস্ট সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফতরে সেই প্রতিবেদন জমা হলে একটি ফাইল এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
‘বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস)’ নামে আইটি অডিট টিম অডিট করে। অডিট প্রতিবেদনে লিড পার্টনার সহজ ডটকমের সঙ্গে চুক্তি বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা ব্যবস্থাগ্রহনে সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-টিকেটিং সিস্টেমের (বিআরআইটিএস) ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর আইটি অডিট পরিচালনা করা হয়।
আওয়ামী সরকারের সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের (বর্তমানে জেলখানায়) হাতেই ৫ বছরের অনুমোদন পায় ‘সহজ ডটকম’, এরপরে ভেঙ্গেছে চুক্তির সব শর্ত। চুক্তি সম্পাদনের পর একই বছরের ২৪ আগস্ট লিট পার্টনার হিসেবে সহজ লিমিটেডকে ১০টি বিষয়ে ১৮ মাসের মধ্যে কর্মসম্পাদনের নির্দেশ দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বিলম্বের জন্য প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে জানায় রেলওয়ে।
২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট চুক্তির ১৮ মাস পূর্ণ হয় এবং ৫টি বিষয়ে তখনো শর্তপূরণ হয়নি। ফলে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলা হয়। এক্ষেত্রে চুক্তির অনুচ্ছেদ (৮) অনুযায়ী কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না সে বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দিলে উত্তরে সহজ জানায়, ‘আইএসও/আইসি ২৭০০১:২০২২ -এর বিজনেস কমিউনিটি, আইসিটি রেডলাইনস এবং রিডানডেন্সি সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ সমূহের গুরুত্ব আমার স্বীকার করছি।’
‘টেন্ডারে কোর রিকায়মেন্ট হিসেবে পৃথক ডিআরসি স্থাপনের সুস্পস্ট উল্লেখ রয়েছে, তাই পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে’ বলে জানায় লিডপার্টনার সহজ। যা আজও পূরণ হয়নি এবং রেল কর্তৃপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে সহজে ডুবেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের সুনাম, মুনাফা ও সেবা। সরকারও হারিয়েছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
অডিটে প্রকাশিত বিষ্ময়কর তথ্য হলো- বাংলাদেশ রেলওয়ের ভ্রমণ ইতিহাসে সকল সাধারণ নাগরিক, সরকারের উচ্চ কর্মকর্তা, সামরিক ও গোয়েন্দার বাহিনীর সদস্যদের তথ্য সিঙ্গাপুরে পাচার করা হয়েছে। বিশেষত বিএনপি সরকারের আমলে দেশের সামরিক ও গোয়েন্দার বাহিনীর সদস্যদের সব ধরনের তথ্য এখন বিদেশিদের হাতে। যা দেশের সার্বভৌম নিরাপত্তা নীতিমালা মারাত্বকভাবে লঙ্ঘন হয়েছে। যা ‘ট্রেজারী রুলস-এর বিধি ৭(১)’ এবং ‘বাংলাশে রেলওয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির Technical Requirements GI E.8 Payment and Collection (PC) এর লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, যেকোন সময়ে ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা ক্লাউড সেবাদাতার নীতিমালায় আকস্মিক পরিবর্তন আসলে, মুহূর্তের মধ্যে রেলওয়ের টিকেটিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে।
মূল ডেটাবেজ ও হোস্টিং বিদেশে থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাংলাশে রেলওয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-টিকেটিং সিস্টেমের (বিআরআইটিএস) ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের উপর আইটি অডিট পরিচালনায় দেখা যায় যে, কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন ব্যতিরেকে ই-টিকেটিং সিস্টেমের মূল ডেটাবেজ ও হোস্টিং দেশের বাইরে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউ এস) ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে (সিঙ্গাপুর অঞ্চল) রাখা হয়েছে। ফলে রেল যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য দেশের বাহিরে চলে যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি বেড়েছে।
তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনসহ সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি
রেলওয়ে যাত্রীদের ব্যক্তিগত উপাত্তের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা না করায় যাত্রীদের সংবেদনশীল তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনসহ সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। রেলওয়ে যাত্রীদের সংগৃহীত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্তসহ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এপিআই অরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে। রেলওয়ের ই-টিকেটিং সিস্টেমের ইউজার রেজিস্ট্রেশন ভেলিডেশনের উদ্দেশ্যে সিস্টেমটি ‘Interlink Techsoft Limited’ নামে অন্য একটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান দ্বারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৭১ হাজার ২৮৫ বার ইসির এপিআই কল করার মাধ্যমে ৮৪ লাখ ৭৫ হাজার ৬৯ টি এনআইডি ভেরিফিকেশন করা হয়েছে।
২ কোটি ৮৯ লাখ ডেটা সিঙ্গপুরের আমাজন ওয়েবে
দেশের ২ কোটি ৮৯ লাখ সেবা গ্রহীতার অত্যান্ত সংবেদনশীল তথ্য বাংলাদেশ রেলভবনের নিজস্ব ডেটা সেন্টারে থাকার কথা থাকলেও রাখা হয়নি। তা এখন আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস সিঙ্গাপুর রিজিয়নে রাখা হয়েছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের আইনি জটিলতায় পড়ে দেশের সংবেদনশীল তথ্যের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চরম ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নেই ডিসাস্টার রিকভারি সেন্টার
রেলওয়ে সদর দপ্তরে সিস্টেমটি পরিচালনার জন্য কোনো নিজস্ব বা ডেডিকেটেড ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হয়নি। রেলওয়ের সঙ্গে ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি’-এর চুক্তির শর্ত থাকলেও এখনো নেই ডিসাস্টার রিকভারি সেন্টার। রেল ভবনের বর্তমান ডেটা সেন্টারে মূল বিআরআইটিএস সার্ভারের পরিবর্তে শুধু এনআইডি যাচাইকরণের কাজে ব্যবহৃত এনআইডি স্টেজ সাভার (এনআইডি স্টেজ সার্ভার) হোস্ট করা রয়েছে।
রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা টিকেট ক্রয়কারী সব নাগরিকের (রেলযাত্রী) নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ভ্রমণ ইতিহাস এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল আর্থিক লেনেেনর তথ্য দেশের বাইরে সংরক্ষিত হচ্ছে। তথ্যগুলো দেশের বাইরের ক্লাউডে থাকায় কোনো কারণে ডেটাবেজটি হ্যাক হলে বা তথ্য ফাঁস হলে তা ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকরা সহজেই পরিচয় চুরি এবং ব্যাপক আর্থিক প্রতারণার শিকার হতে পারেন। সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের তথ্য সেখানে রয়েছে, পাচার করা হয়েছে।
ড্যাসবোর্ড অপব্যবহার করে অবৈধভাবে টিকেট ব্লক
ই-টিকেটিং সিস্টেমের উপর আইটি অডিট পরিচালনায় দেখা যায় যে, ই-টিকেটিং সিস্টেমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাসবোর্ড অপব্যবহার করা হয়েছে। ড্যাসবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত টিকেট সবার জন্য অনলাইনে অবমুক্ত করার ১-৫ দিন আগেই অর্থাৎ যাত্রার তারিখ থেকে ১১-১৫ দিন পূর্বেই অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার সুযোগ রয়েছে। নিরীক্ষা দল কর্তৃক চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে সিস্টেমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাসবোর্ড ব্যবহার করেছে। তাদের সক্রিয় ইউজারের তালিকা পাওয়া যায়, যা ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণাধীনে রয়েছে।
ভ্যাসবোর্ডের ‘ট্রিপ’ মেনু ‘ওরেঞ্জ ট্রিপস’ সাবমেনু থেকে ট্রেনের টিকেট অনলাইনে সর্ব সাধারণের জন্য অবমুক্ত করার আগে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকেট ব্লক করেন। সিলেট স্টেশনে দায়িত্বরত ভেন্ডর প্রতিনিধির অ্যাডমিন ড্যাসবোর্ড থেকে বিষয়টি রি-পারফর্ম করে দেখা যায়, দেশের রেলওয়ের যেকোনো রুটের টিকেট সাধারণ যাত্রীদের জন্য অবমুক্তির পূর্বেই ‘ওপেন ফর অল’ কোটা থেকে ‘অনলি ফর অফ লাইন’ কোটাতে ব্লক করা যায়।
রেলওয়ের যেকোনো রুটের টিকেট কালোবাজারি
ই-টিকেটিং সিস্টেমের কন্ট্রোল ঘাটতি থাকার কারণে, স্টেশনের দায়িত্বরত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ লিমিটেডে প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বুকিং সহকারী কর্তৃক যোগসাজশে দেশের যেকোনো রুটের টিকেট কালোবাজারি করা সম্ভব। ফলে, মধ্যস্বত্ব ভোগী বা দালাল শ্রেণির দৌরাত্ম্যে টিকেট কালোবাজারির মাধ্যমে রেল যাত্রীরা সেবা প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। অধিকন্তু ই-টিকেটিং সিস্টেমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাসবোর্ড দিয়ে সম্পন্ন কার্যক্রমের কোনো অ্যাকটিভিটি লগ বা অডিট লগের রিপোর্ট দেখার সুযোগ নেই। অন্য উপায়ে এই অনিয়ম শনাক্ত বা সহজে প্রতিরোধ করাও সম্ভব নয়।
টিকেটের বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি ও জরিমানা দেয়নি
সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর মাসিক বিক্রয় প্রতিবেদন অনুযায়ী অনলাইন টিকেটের বিপরীতে (এমএমএস) প্রাপ্ত সাত ভ্যাট এবং সহজ কর্তৃক এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমাকৃত ভ্যাটের মধ্যে মোট ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯০২ টাকা ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন টিকেট বিক্রয় বাবদ প্রকৃত আয়ের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে কম টাকা জমা দেয়ায় সরকারের ৮ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, ই-টিকেটিং সিস্টেম দীর্ঘসময় অকার্যকর থাকা সত্ত্বেও চুক্তির শর্তানুযায়ী ভেন্ডরের কাছে হতে জরিমানার অর্থ কর্তন না করায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ী রেখেছে। অনুসন্ধানে আরও অনিয়ম উদ্ঘাটিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়ে অডিটে।
ই-টিকেটিং লাইভ সার্ভার অবৈধভাবে সহজ লিমিটেডে
আইটি অডিট পরিচালনায় দেখা যায় যে, চুক্তিপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ই-টিকেটিং লাইভ সার্ভারের অ্যাডমিন প্যানেল ও টিকেট অপারেশনে সহজ লিমিটেডের কর্মীদের অবৈধভাবে নিয়োজিত রাখা স্বত্বেও ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আরোপ না করায় অনিয়ম হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সহজ লিমিটেডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে লাইভ সার্ভারের অফিসিয়াল অ্যাডমিন প্যানেল এবং সার্বিক টিকেট অপারেশন ব্যবস্থা রেলওয়ের নিজস্ব কর্মীদের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকার কথা থাকলেও বাস্তব পরিদর্শনকালে তা সম্পূর্ণরূপে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ -এর প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শর্তানুযায়ী ভেন্ডর সহজের কাজ কি
চুক্তির শর্তানুযায়ী ভেন্ডরের (সহজ) নিয়োজিত কর্মীরা শুধুমাত্র সিস্টেমের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য অনুমোদিত। তারা কোনো অবস্থাতেই টিকেট বিক্রি, ক্রয়, কোটা সমন্বয়, আসন সংরক্ষণ, টিকেট ব্লক বা রিলিজসহ কোনো প্রকার টিকেটিং অপারেশনে যুক্ত হতে পারবে না। তার শুধু প্রতি টিেিকটের বিনিময়ে ২০ পয়সা পাবেন।
প্রতিটি অনৈতিক ঘটনার জন্য ভেন্ডরকে ৫ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করার এবং মাসিক বিল থেকে তা কর্তন করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন একাউন্ট সহজ-এর কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এসব একাউন্ট ব্যবহার করে কোটা সমন্বয়, আসন ব্লক/রিলিজ, কাউন্টার তৈরি, ট্রিপ যোগ করা ও অনলাইন-অফলাইন টিকেট হস্তান্তরের মতো সব স্পর্শকাতর টিকেট অপারেশন সরাসরি সম্পন্ন করছে। যা স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র নং ৫৪.০১.২৬০০.০০৭. ১৮.০১৩.১৯-১২০ এর ৬ নম্বর ক্লজ —এর সরাসরি লঙ্ঘন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি
দেশের প্রায় ১৬৩টি স্টেশনে ক্রমাগত চুক্তি ভঙ্গ করে ভেন্ডর কর্মীদের এসব অ্যাডমিন অপারেশন চালানো হলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অদ্যাবধি কোনো জরিমানামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। চুক্তি মোতাবেক সময়মতো জরিমানা ধার্য ও মাসিক বিল থেকে কর্তন না করে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
চুক্তির শর্ত পরিপালন করা হয়নি
বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সহজ লিমিটেডের (লিড পার্টনার সহজ, সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি) মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির Technical Requirements Gi E.3 Ticket Quota Allotment (TA)/TA-01 তে উল্লিখিত The system should be able to allot tickets as per issuing stations following BRs guidelines. The tickets will be allotted when a train is scheduled in the system.” মোতাবেক কোটাভুক্ত টিকেটের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্ত আলোচ্য ক্ষেত্রে তা পরিপালন করা হয়নি।
যা বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সহজ লিমিটেডের (লিড পার্টনার সহজ, সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেডি) মধ্যে ১৫/০২/২০২২ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র নং: ৫৪.০১.২৬০০.০০৭.১৮.০১৩.১৯-১২০ এর Technical Requirements Gi E.3 Ticket Quota Allocation (TA)/TA-01 লঙ্ঘন বলে জানায় সরকারের পরিবহন অডিট অধিদপ্তর।
পরিবহন অডিট অধিদপ্তর জানায়, সিস্টেমের মূল ডেটাবেজ ও হোস্টিং দেশের বাইরে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে (সিঙ্গাপুর রিজিয়নে) করা হয়েছে। এ বিষয়ে ক্লাউড কম্পিউটিং নীতিমালা, ২০২১ এর প্যারা ০৯ (খ) অনুযায়ী, নাগরিকদের তথ্যটি ভৌগোলিক সীমানার বাহিরে সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন মোতাবেক বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের পরামর্শ ও পূর্ব অনুমোদন গ্রহণ করা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই তা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি’ নামে তিনটি কোম্পানি একত্রে থাকলেও কার্যত ২০২২ সালের চুক্তির পরই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে দ্বন্দ্বে আলাদা হয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সরকারের সঙ্গে ৫ বছরের এই চুক্তি হয়। তবে লিডিং পার্টনার হিসেবে পরিচালনা করছে সহজ ডটকম। তবে সম্প্রতি (প্রায় দেড় মাস আগে) সহজ ডটকমের চেয়ারম্যান মালিহা এম কাদির সব তার স্বত্ত্ব ছেড়ে দিয়ে আমেরিকায় অবস্থান নিয়েছেন বলে ভিন্ন একটি সূত্র জানিয়েছে।
‘সহজ-সিনেসিস- ভিনসেন জেভি’ এর পরিচিতি ও বক্তব্য
সিনেসিস আইটি: সিনেসিস আইটি লিমিটেড হলো বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত ডিজিটাল রূপান্তর ই-গভর্ন্যান্স, হেলথ-টেক বা মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা এবং বড় পরিসরে আইটি কনসালটেন্সি ও সলিউশন নিয়ে কাজ করে। সিনেসিস আইটি বাংলাদেশ সরকারের ১৫০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের সফটওয়্যার ও সিস্টেম তৈরিতে কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ই-রিটার্ন সিস্টেম।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কথা হয়েছে সিনেসিস আইটির চিফ সল্যুশন অফিসার মো. আমিনুল বারি শুভর সঙ্গে। ই-টিকেটিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অংশীদারদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট ও পৃথক দায়িত্ব ছিল। তবে রেলওয়ের টিকিটিং ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত অপারেশনের সঙ্গে সিনেসিস আইটির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। এসব অপারেশনাল কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে সহজ ডটকম।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বলেন, ‘আমরা এই প্রকল্পে কোন বিনিয়োগ করিনি। চুক্তির এক মাস পরই ইন্টারনাল কারণে প্রজেক্ট থেকে আমরা সরে এসেছি। লিডিং পাটনার হিসেবে সহজ লিমিটেড একাই ভালমন্দ সবকিছুর ভাগিদার।’
ভিনসেন জেভি: ভিনসেন্ট কনসালটেন্সি হলো দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ওয়েস্টার্ন গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি একটি অস্তিত্বহীন ও কাগুজে কোম্পানি। যার অস্তিত্ব সম্পর্কে গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগও অজ্ঞাত। রেলের ই-টিকেটিং প্রজেক্টে ভিনসেন্ট কনসালটেন্সি (ভিনসেন জেভি) কোন দায়িত্ব পালন করছে— জানতে চাইলে গ্রুপের কনসালটেন্ট মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমরা শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেছি, চুক্তির পরে কোন কাজের সঙ্গেই জড়িত ছিলাম না, এখনো নাই।’ অডিট আপত্তি সম্পর্কে গ্রুপের অফিসে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজে যেহেতু নাম আছে, তাই কোনভাবেই আমরা এই দায় এড়াতে পারিনা।’
সহজ ডটকম
সহজ ডটকম লিমিটেডের চেয়ারম্যানের মালিহা এম কাদির বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করেছেন। হোয়াটঅ্যাপে তাকে লিখিতভাবে প্রধানত নয়টি বিষয়ে অডিট আপত্তি তুলে ধরে উত্তর দিতে অনুরোধ জানানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি বলেন, ‘এসব কিসের অডিট, আমি এসব কিছু জানি না’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর গত কয়েক দিনে তাকে কয়েক বার তাকে ফোন দেয়া হলেও রিসিভ করেননি।
সদ্য যোগদানকারী সহজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিইও কর্ণেল (অব.) আমিনুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। একই বিষয়ে হোয়াটঅ্যাপে তাকেও নয়টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। এরপর সাক্ষাতে উত্তর দেবেন বলে বনানীর অফিসে আসতে বলে তিনিও যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং পিআর এজেন্সি যোগাযোগ করবে বলে জানান তিনি। এরপর বনানী অফিসে গিয়েও তার দেখা পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের বক্তব্য
দীর্ঘ সময়েও রেল বিভাগ কেন সহজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি জানতে চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিজি আফজাল হোসেনের কাছে। হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলেও ‘তিনি কোন মন্তব্য’ করেননি। তবে রেলওয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রূপম আনোয়ার বলেন, ‘রিপোর্ট তো আমার কাছে আসেনি। আসলে আমরা জবাবদিহি করার ব্যবস্থা নেব’।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময়েও কেন ব্যবস্থা বা জরিমানা করেনি —এ বিষয়ে সরকারের রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে জানতে তাকে ফোন করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ঢাকার রেলভবনে রেলপ্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না, আপনার কাছে প্রথম জানলাম। তবে এমনটি হয়ে থাকলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসবে।’ এ বিষয়ে জেনে মন্তব্য করতে চান জানালেও কয়েক দিনের চেষ্টায় সাক্ষাতে তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বক্তব্য
দেশের ২ কোটি ৮৯ লাখ মানুষের এনআইডির তথ্য বিদেশে পাচার সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের (ইসি) বর্তমান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি প্রথম জানলাম। আর এমনটি হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।