সকল মেনু

১০টি শিল্পগোষ্ঠীর ১৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার জব্দ

বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফেরত সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে সরকারের আন্তঃসংস্থা একটি টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করেছে। গঠিত টাস্কফোর্স এখন পর্যন্ত জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদের পরিমাণের তথ্য প্রকাশ করছে।

তদের সঙ্গে দেশের ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তাদের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা জব্দ এবং বিদেশে যাওয়ার জন্য ৮৪ জনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আদালত।

মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের সপ্তম সভায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সভায় দ্রুত মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, অর্থপাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গভর্নর এই বিষয়টি নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য দ্রুত মামলা শেষ করার ওপর জোর দেন এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।

শেখ হাসিনা পরিবারের বাইরেও ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর ওপর তদন্ত চলছে। যার মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপ। এসব শিল্পগ্রুপের প্রধান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও এই তদন্তের আওতায় রয়েছে।  গ্রুপের কর্ণধারদের অনেকে বাংলাদেশে নাগরিকত্বও ত্যাগ করেছেন।

তাদের মধ্যে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলামের স্ত্রী ফৌজিয়া ইসলামের নামে থাকা ১৪টি কোম্পানির শেয়ার ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব শেয়ারের মূল্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার ৪৮০ টাকা।

গত সেপ্টেম্বরে সরকার বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনার জন্য নতুন করে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সে সভাপতিসহ মোট ৯ সদস্য রাখা হয়েছে। পূর্বে টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪।

প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে- সিআইডি, এনবিআর ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য সংস্থার একটি যৌথ তদন্ত দল। যা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বাংলাদেশ ব্যাংকে এই বিষয়ের নথিপত্র প্রস্তুত করার কাজ চলছে। সম্প্রতি গভর্নর আহসান এইচ মনসুর লন্ডন সফর করেন। যেখানে তিনি পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

গত সফরকালে গভর্নর তাদের জানিয়েছিলেন যে, যদি যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তিনটি। গভর্নর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে এসে অর্থ পাচারের মামলাগুলো পর্যালোচনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

তাজুল ইসলামের স্ত্রী ফৌজিয়া ইসলামের শেয়ার ফ্রিজ: ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন গালিবের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। এছাড়া ফৌজিয়া ইসলামের নামে ইজারা ও বায়না দলিলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় ৩০৪ দশমিক ৫৯ একর জমি, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট ক্রোক, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

দুদকের পক্ষে সংস্থাটির উপপরিচালক আবু মোহাম্মদ আনোয়ারুল মাসুদ এসব সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ চেয়ে আবেদন করেন।

জানা যায়, ফ্রিজ হওয়া অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ১২টি ব্যাংক হিসাব ও ১৪টি কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। ব্যাংক হিসাবগুলোতে আছে এক কোটি ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১৩৫ টাকা। আর শেয়ারের মূল্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার ৪৮০ টাকা। জব্দ হওয়া স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকার গুলশানে জমিসহ একটি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামের হালিশহরে চার তলা পাকা বাড়ির তিনভাগের একভাগ অংশ রয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানের লামা উপজেলায় ইজারা ও বায়না দলিল মূলে ৫৩ দলিলে প্রায় ৩০৪ দশমিক ৫৯ একর জমি রয়েছে।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, ফৌজিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৪ টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন ও দখলে রাখা এবং তার স্বামী মো. তাজুল ইসলাম কর্তৃক অসদুপায়ে উপার্জিত অর্থ দ্বারা স্ত্রীর নামে ৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৪ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনে সহায়তা প্রদান এবং ১১টি ব্যাংক হিসাবে ১৩ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ২০৩ টাকা জমা ও ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৪৪ হাজার ৯৭৫ টাকা উত্তোলনসহ সর্বমোট ২৭ কোটি ১১ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮ টাকা হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরপূর্বক আয়ের উৎস আড়াল করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা তৎসহ পেনাল কোডের ১০৯ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

মামলা তদন্তকালে তার নামে ব্যাংক হিসাবসমূহে গচ্ছিত অর্থের তথ্য পাওয়া যায়। যা তিনি যেকোনো সময় হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করছেন বলে জানা যায়।

এর আগে ১৩ এপ্রিল সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের নামে থাকা ঢাকা, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের ২৮ বিঘা জমি, কুমিল্লার বিভিন্ন জায়গায় থাকা দুইটি বাণিজ্যিক স্পেস, একটি ফ্ল্যাট ও একটি দোকান ক্রোকের আদেশ দেন আদালত।

এ ছাড়া তার নিজ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৫০টি ব্যাংক হিসাব ও শেয়ারে জমাকৃত ২৮ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top