স্টাফ রিপোর্টার: ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে কয়েক মাস ধরেই। এরমধ্যে এক মাসের ব্যবধানে মান কমেছে ৫ শতাংশের বেশি। আর এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ। -যেকারণে ক্রমশঃ অস্থির হচ্ছে মূদ্রা বাজার। আর, তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা।
দেশে টাকার মান কমার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির যত দায়, -তার থেকে অনেক বেশি দায়ী মানি চেঞ্জাররা। নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে না তাদের অনেকেই। কেউ আবার অবৈধ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। ডলারের দাম বাড়াতে করছে কারসাজি।
অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছুদিন যাবৎ মানি চেঞ্জার ও ব্যাংক পরিদর্শনে নেমেছে তারা। ডলার কেনা-বেচায় বিভিন্ন অনিয়মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয় ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে। আর, রোববার (৩১ জুলাই/২০২২) রাজধানীর তিনটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (১ আগষ্ট/২০২২) স্থগিত করা হয় আরো দু’টি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স। যদিও ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে ২৩৫ টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান। আর ব্যবসা করছে সাত শত এর বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম মঙ্গলবার (২ আগষ্ট/২০২২) বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ৮০ টি মানি চেঞ্জার পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে ডলার কেনা-বেচায় অনিয়ম করায় ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। আর, স্থগিত করা হয়েছে ৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স।
তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া ৯টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ব্যবসা দেখভাল্ করার দায়িত্ব আইনশৃংখলা বাহিনীর। সেজন্য ডিএমপিকে (ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ) নির্দেশ দেয়া হয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠান সিলগালা করতে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, পরিদর্শন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের। ডলার নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান কারসাজি করলে বাতিল করা হবে তাদের লাইসেন্স।
তিনি বলেন, পরিদর্শনে দেখা গেছে, যাদের লাইসেন্স আছে তারা ছাড়াও অনেকে ডলার কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে, -তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া ডলার কেনাবেচায় জড়িত প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাদের।
তিনি আরো বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ডলার সেল করলেও তা এন্ট্রি করেনি। বিষয়টি জানতে চাইলে যথাযথ জবাব পাওয়া যায়নি। বরং, মাত্রাতিরিক্ত টাকা পাওয়া গিয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠানে।
খোলাবাজারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও পরিদর্শনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে। তা হলো- যে ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি করবে, সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই রপ্তানি আয় আনতে হবে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো কী পরিমাণ ডলার কিনছে এবং কি রেটে কিনছে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি, তাদের ধারণ ক্ষমতাও কমিয়ে আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের কোন অনিয়ম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে বেশ কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, এখন ৩ মিলিয়নের (৩০ লাখ ডলার) বেশি আমদানি এলসি খোলার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। আগে যা ৫ মিলিয়ন ছিল।
তিনি আরো বলেন, এর আগে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে ব্যাংকগুলোতেও পরিদর্শক দল পাঠানো হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে আবার পরিদর্শন করা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।
প্রসঙ্গত, এক ডলারের জন্য আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে খরচ করতে হয়েছে ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা। , আর, নগদ ডলারের দাম বেড়ে ১০০ টাকার ওপরে উঠেছে সব ব্যাংকেই। আবার, কোনো কোনো ব্যাংক ১০৫ থেকে ১০৮ টাকায়ও বিক্রি করছে। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে ধানমন্ডি, পল্টন, মতিঝিল, বনানী এলাকার ২২টি মানি চেঞ্জার পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) কর্মকর্তারা।
খোলাবাজারে গত ২৬ জুলাই, মঙ্গলবার ডলারের দর সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১১২ টাকায় বেচাকেনা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরদিন বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত শুরু করলে বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ধ হয়ে যায় খোলাবাজারের মতো ডলার বেচাকেনা।
আবার, ডলারের দামের কারসাজি নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের যুগ্ন পরিচালক মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মঙ্গলবার (২ আগষ্ট) রাজধানীর দিলকুশায় চলে পরিদর্শন। এসময় দিলকুশার উত্তরা ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন শাখা (এডি) থেকে আটক করা হয়েছে তিন দালালকে। মানি চেঞ্জারে গ্রাহক ভাগিয়ে নেয়ার জন্য প্ররোচিত করছিল তারা। দালালদের আটকে সহায়তা করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।