সকল মেনু

২১ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার, বিপুল প্রভিশন ঘাটতি এবং বছরের পর বছর জমতে থাকা লোকসান ও মূলধন ঘাটতির চাপে দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ মার্চ প্রান্তিকের হিসাব বলছে, দেশের ২১টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের ঘাটতি এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআর ঋণাত্মক তিন অঙ্কে নেমে গেছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ব্যাংকটির সিআরএআর নেমে গেছে ঋণাত্মক ৪৮৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকটির মূলধন সক্ষমতা যে পর্যায়ে থাকার কথা, বাস্তবে তার অবস্থান তার তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। ব্যাংকটির ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সিআরএআর ঋণাত্মক ১০৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পাশাপাশি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এই ছয় ব্যাংকের সম্মিলিত ঘাটতিই প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছয় ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটিই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এর বাইরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৫৪ কোটি টাকা।

তবে মূলধন সংকট শুধু ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রচলিত ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও আটটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এ তালিকায় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ন্যাশনাল ব্যাংকের- ১১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের ঘাটতি ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৬ হাজার ২৫২ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা। একইভাবে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, বিসিবিএলের ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, ইউসিবির ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ৭৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। এ খাতের ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬৯৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৫ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ৪২৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংকের ঋণ আদায়, খেলাপি ঋণ ও লোকসানের সমস্যা থাকলেও মূলধন সংকট থেকে তারা কার্যকরভাবে বের হতে পারেনি।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর চিত্রও উদ্বেগজনক। এ খাতের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ৩৩ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা এবং গ্রুপটির সিআরএআর ঋণাত্মক ৭৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর বড় অংশই বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। দীর্ঘদিনের বড় অঙ্কের ঋণাত্মক রিটেইনড আর্নিংস ব্যাংকটির মূলধনভিত্তির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। পাশাপাশি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকেরও প্রায় ২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

শুধু ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর চিত্র নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের হিসাবও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। গত মার্চ প্রান্তিকে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআর নেমে গেছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে।

ব্যাংকের মূলধনকে তার আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ মূলধনই ব্যাংককে সম্ভাব্য লোকসান ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা দেয়। কিন্তু বছরের পর বছর লোকসান হলে ব্যাংকের রিটেইনড আর্নিংস বা জমা রাখা আয় কমতে কমতে একসময় ঋণাত্মক হয়ে যায়। তখন পরিশোধিত মূলধন ও অন্যান্য তহবিল থাকলেও সেগুলো দিয়ে জমে থাকা লোকসানের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে সংকটে থাকা অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। ঋণের বড় একটি অংশ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বেড়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকিং খাতে তৈরি হয়েছে আরও বড় ঘাটতি। গত জুন শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে একদিকে ব্যাংকের সম্পদের মান খারাপ হয়েছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণও করা সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খেলাপি হিসেবে সামনে আসতে শুরু করেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দ্রুত বেড়েছে এবং একই সঙ্গে বেড়েছে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, একটি ব্যাংকের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা বোঝার অন্যতম প্রধান সূচক হলো মূলধন পর্যাপ্ততা। উন্নত দেশগুলোতেও ব্যাংকের সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথমেই মূলধন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বছরের পর বছর মূলধন ঘাটতিতে থাকা অনেক ব্যাংক এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, এত বড় মূলধন ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে। শেয়ারহোল্ডাররা নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করবেন কি না, কৌশলগত বা নতুন বিনিয়োগকারী পাওয়া যাবে কি না, নাকি শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থের ওপরই নির্ভর করতে হবে- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ব্যাংকের মূলধন সংকট শুধু হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িত ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা, আমানতকারীর আস্থা, ঋণ বিতরণের ক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা।

একসঙ্গে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি যখন প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা এবং পুরো ব্যাংক খাতের ঘাটতি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা, তখন এটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, দীর্ঘদিনের লোকসান, দুর্বল সুশাসন এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার যে চক্র তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে না পারলে ব্যাংকিং খাতের মূলধন সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর সেই সংকটের শেষ বোঝা কতটা আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়বে- সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top