চৌধুরী নাফিজ সরাফাত পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। সাবেক ‘ফারমার্স ব্যাংক’ -এর দূর্দাশা ঘুচাতে নতুন ‘পদ্মা ব্যাংক’ নাম দিয়ে নাবিক হিসেবে তার দায়িত্ব নেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন দূর্নীতির আরেক বরপুত্র সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
দুজনে মিলে শেয়ারবাজারে অবৈধ বিনিয়োগ ও বেনামি ঋণে ব্যাংক খাতের দুর্গতি আরো বাড়িয়ে তোলেন। দুজনে বেরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের শেয়ার লিখে নেয়া এবং বেস্ট হোল্ডিং লিমিটেড কোম্পানির বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন। যদিও পরে তা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা দুর্নীতির দায়ে ৬টি বিও হিসাব ফ্রিজ করে রেখেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের সাধারণ কর্মী হিসেবে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের জীবনের শুরু হলেও তিনি এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ৮০০ কোটি টাকা ভরেছেন নিজের পকেটে। ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক চিত্রে অসঙ্গতি ও স্বেচ্ছাচারি আচরণে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন তিনি। তবে ৮০০ কোটি টাকা লোপাটের সেসময় সরব না হলেও ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পটপরিবর্তনের পরেই দুর্নীতির তালিকায় সালমান এফ রহমাসসহ তারও নাম আসছে।
অল্প সময়ে এবং কিভাবে এতো সম্পদের মালিক হলেন তাই খুঁজতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে নামছেন দুদকের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ও উপসহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম।
সাবেক আইজিপি বেনজীরের সঙ্গে তার বিশষ সখ্যতা। তার সহচর্যে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত সিনিয়র এক সাংবাদিকের বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের শেয়ার জোরপূর্বক লিখে নেয়ায় পরই আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন। এরপর থেকে দূর্নীতির বরপুত্র হিসেবে তার নাম চারদিকে চাউর হতে থাকে।
একটি সূত্র বলছে, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত অবৈধভাবে টাকা কামালেও সেই টাকা দেশে রাখেনি। পাচার করেছেন কানাডায়। সেখানকার বেগমপাড়ায় তারও বসতি বা আলাদা সাম্রাজ্য রয়েছে। বিপদে কানাডার আশ্রয় নিতে পারেন সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা করেন বলে জানান তার ঘনিষ্টরা।
আর্থিক খাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত যে টেকসই হয় না, তার বড় একটি উদাহরণ হয়ে রয়েছে পদ্মা ব্যাংক। কারণ, ব্যাংকটিকে এমন কোনো সুবিধা নেই, যা এটিকে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও শেষ পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংক নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যাংকটির ৬২ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। জমা রাখা টাকাও ফেরত পাচ্ছে না অনেক গ্রাহক।
শিল্পোদ্যোক্তা ড. চৌধুরী নাফিজ সরাফাত
ড. চৌধুরী নাফিজ সরাফাত একজন শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। তিনি দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা, লা মেরিডিয়ান ঢাকা, শেরাটন ঢাকা ও ম্যারিয়টসহ একাধিক চেইন হোটেলের পৃষ্ঠপোষক। দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রায়ত্ব চা বাগান ন্যাশনাল টি লিমিটেডের পরিচালক।
চতুর্থ প্রজন্মের বাণিজ্যিক পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আর-এলএনজিভিত্তিক ৬০০ মেগাওয়াটের পাওয়ার প্ল্যান্ট ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের (যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিকের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে গড়া) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সর্ববৃহৎ বেসরকারি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট রেইস ম্যানেজমেন্ট পিসিএলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান এলআইসি বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষক ও চেয়ারম্যান।
বর্তমানে তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এপিইউবি) বোর্ড সদস্য, দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার হাউজের (কানাডা) সভাপতি, নিউজবাংলা টোয়েন্টি ফোর ডট কম-এর সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি।
এছাড়াও তিনি কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব ও আর্মি গলফ ক্লাবের সদস্য, ওয়ার্ল্ড চেজ ফেডারেশনের (বাংলাদেশ বিভাগ) সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্সের (সদস্য) সঙ্গে জড়িত, বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, ইনফরমেশন সিস্টেমস অডিট অ্যান্ড কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের (ইউএসএ) সদস্য।
২০০৯ সালে আওয়ামী সরকারে উত্থান
২০০৯ সালে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। সরকারের ছত্রছায়ার প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই ১০ বছরে হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। এরপরেই শেয়ার বাজার ও ব্যাংক দখলে নিয়ে টাকা লুণ্ঠন করতে থাকেন। তার প্রধান পৃষ্টপোষক ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের সঙ্গে। তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে পুলিশের প্রটোকলে সিনিয়র সাংবাদিক শফিকুর রহমানের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের শেয়ার লিখে দেন দুজন। দেশের শীর্ষ একটি হোটেলে বেনজির আহমেদেও পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে শেয়ার লিখে নেয়ার অভিযোগ করেন আওয়ামী সরকারের এমপি ও সাংবাদিক শফিকুর রহমান। যদিও এ বিষয়ে পরে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত তার সংবাদপত্রে ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত, সম্মানহানীকর ও ভুল’ মন্তব্য বলে প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন তিনি।
ঋণ কেলেঙ্কারিতে ফারমার্স ব্যাংক বন্ধ
অনিয়ম আর ঋণ কেলেঙ্কারিতে ফারমার্স ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটে ২০১৭ সালে। সে সময় চাপের মুখে চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর। পরের বছর ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ফারমার্স ব্যাংকের নাম হয় পদ্মা ব্যাংক।
পদ্মা ব্যাংককে উদ্ধার করতে সরকারের উদ্যোগে রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে ৭১৫ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেওয়া হয়, যা ওই সময়ে ব্যাংকটির মোট মূলধনের ৬৬ শতাংশ।
বেনামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজ উদ্যোগে ঋণদান ও অস্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদনের কারণে আলোচনায় আসেন তিনি। এ সময়ে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছিল না পদ্মা ব্যাংক। এমতাবস্থায় ২০২০ সালে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব দেয় তারা। আরেকটি প্রস্তাবে যোগান দেয়া মূলধনের বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমপরিমাণ ৩হাজার ৫০০ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা যেভাবে
ফারমার্স ব্যাংকের শুরুই অনিয়মের মধ্য দিয়ে। কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পাওয়ার আগেই সাইনবোর্ড বসিয়ে লোকবল নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মাহবুবুল হক চিশতী। ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই ঋণ বিতরণে অনিয়মের নানা তথ্য আলোচনায় আসতে শুরু করে। ফলে আমানতকারীরা টাকা তোলা শুরু করেন, চাপে পড়ে ব্যাংকটি। নগদ অর্থের চরম সংকটে পড়লে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
এ পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য হন মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও মাহবুবুল হক চিশতী। ব্যাংকটির এমডি এ কে এম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে, ঋণ গ্রাহকের টাকা জমা হয়েছিল চেয়ারম্যান ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যানের ব্যাংক হিসাবে। এখন জেলে আছেন মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী এবং তাঁর ছেলে রাশেদুল হক চিশতী। গত বছরের অক্টোবরে ১৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় তাঁদের ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।
কমাতে গিয়ে পদ্মা ব্যাংকের ঋণ আরো বাড়ল
পদ্মা ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর আমানত ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণই ছিল ৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশই ছিল খেলাপি।
ব্যাংকটির ঋণ থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে আমানতের সুদ পরিশোধ করা হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে পদ্মা। পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় গ্রাহকের আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি খাত থেকে পাওয়া ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে সফল হয়নি ব্যাংকটি।
অবশেষে পদ্মা ব্যাংকের দুর্দশা নিয়ে আলোচনার মধ্যে চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন নাফিজ সরাফাত। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় গত মার্চে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একভূত হওয়ার চুক্তি করে পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদ।
শেয়ারবাজার থেকে অর্থলোপাট
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক পরিচালক জানান, তার (নাফিজ সরাফাত) বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার থেকে অর্থলোপাট ও ফারমার্স ব্যাংক দখলের অভিযোগ রয়েছে। মাস খানেক আগে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে ৮০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে দুদকের কাছে। ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে এতদিন ব্যবস্থা না নেয়া গেলেও। এবার নড়েচড়ে বসেছে দুদক।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে অডিট রিপোর্ট ও নথিপত্র তলব করে চার দফায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই অনুসন্ধানে গতি আসবে, বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।