সকল মেনু

নাফিজ সরাফাতকে আটক করতে সিআইডিকে পাশে চায় বিএসইসি

প্রবল গণজোয়ারে ভেসে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ভাইস্তা’ চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের অর্থ পাচার সম্পর্কে আগেই তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (সিআইডি)। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ১৩ বছরে হাজার কোটি টাকার মালিক তিনি। অপ্রতিরোধ্য সেই তিনি আটক হতে যাচ্ছেন।

তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সহযোগিতা নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চলতি সপ্তাহেই সেই অভিযান শুরুর আভাস মিলেছে। সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগের কারণ ও তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে গতকাল রাতে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাসুদকে ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে আজ রোববার নতুন সিদ্ধান্ত নিতে কমিশনের বৈঠকও হতে পারে।

ইতোমধ্যে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের নামে নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে সিআইডির তৈরি প্রতিবেদনটি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তবে আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে।

নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ সম্পর্কে বিএসইসির শীর্ষ এক কর্মকর্তা গত রাতে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তিনি কোথায় নেই। আমরা তো তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারি না। তাকে আটক বা তার সম্পদ জব্দের সিদ্ধান্তও দিতে পারি না। সিআইডির সঙ্গে বিভিন্ন কাজেই আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। তবে আপনি যা ভাবছেন, সেটি আমি মনে করছি না।

বিএসইসির সাবেক কমিশন নানাভাবে বিতর্কিত। তাদের অধিকাংশের নামে অর্থ লুটপাটসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। নবগঠিত তদন্ত কমিটির অধিকতর অনুসন্ধানের বাইরে তারাও নেই। বিতর্ক রয়েছে, এমন খলনায়কদের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে চায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির মূলে খলনায়ক সম্পর্কে পুলিশের কাছে আরও তথ্য চায় বিএসইসি। তবে প্রবল ক্ষমতার উৎসমুখে থাকা চৌধুরী নাফিজসহ শেখ হাসিনা সরকারে থাকা অধিকাংশের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে বিচক্ষণ কমিশন। সম্পদ জব্দসহ আরও নতুন কৌশল নির্ধারণে করে ছক করছে নব্য কমিশন।

তদন্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বিশেষ একটি পক্ষ দাবি করেছে, পুঁজিবাজারের সঞ্জার ঘটায় এমন প্রতিষ্ঠানগুলো বিগত দিনে নিষ্ক্রিয় ছিল। সরকার পতনের পরে নব্যগঠিত বিচক্ষণ কমিশন তা সক্রিয় করছে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজার লুটের কারিগরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই পরিবর্তিত কমিশন সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করছে।

অন্যদিকে, পুলিশের একটি সূত্র গতকাল শনিবার জানিয়েছে, নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করছে বিএসইসি। কেননা, সিআইডির নিজস্ব শাখা আরও দুই বছর আগে এই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে বিএসইসিকে জানায়। তৎকালীন কমিশন ব্যবস্থা না নিয়ে আরও দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়। সেসব তথ্য আমলে নিয়ে বিচক্ষণ কমিশন প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

নাফিজ সরাফাতের উত্থান: আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন খাতের অন্যতম প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন নাফিজ সরাফাত। শুরুতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন। পরে তার সখ্য গড়ে ওঠে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সুসম্পর্কের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। গোপালগঞ্জের এই ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে ‘ফুফু’ বলে সম্বোধন করতেন। আর সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ছিলেন তার ‘চাচা’। গোপালগঞ্জের মানুষ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ‘কাজিন’ হিসেবে অন্যদের কাছে পরিচয় দিতেন। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৯৯৯ সালে চাকরিজীবন শুরু করে মাত্র ১৩ বছরেই হাজার কোটি টাকার মালিক তিনি।

তার আগেই চৌধুরী নাফিজ একটি মিউচুয়াল ফান্ডের লাইসেন্স নেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে। এরপরে বাংলাদেশ রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট নামক একটি কোম্পানি খোলেন। যেখানে তার মালিকানা ২৫ শতাংশ। বাকি মালিকানা অন্য অংশীদার হাসান ইমামের। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গত জুন থেকে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিলগুলোর ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করেছে। আরও অধিকতর যাচাইয়ের মাধ্যমে নতুন করে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। মাত্র ১৩ বছরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন খাতে অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হন নাফিজ।

নাফিজ পরিবারের সম্পদ: পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লুফে নিয়েছেন। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোয় মালিকানার পাশাপাশি নাফিজ সরাফাত আরগাস ক্রেডিট রেটিং সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান। আর কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির পর্ষদে আছে তার ভাইবোন ও ছেলেমেয়ে। পদ্মা ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার এবং ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ারের পরিচালক তিনি।

ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, গ্রিন রোড, গুলশান, বারিধারা ও নিকুঞ্জে নাফিজ, তার স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে আটটি ফ্ল্যাট রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, কানাডায় নাফিজ পরিবার একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। রয়েছে নিজস্ব গণমাধ্যম।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top