এ এস এম সাদ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা ৯ ব্যাংক নিয়ম মেনে আমানতের নির্দিষ্ট একটি অংশ সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে জরিমানার মুখে পড়েছে।
তালিকায় রয়েছে– সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের পর্ষদ এক সময় চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তথ্য সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এসএলআর সংরক্ষণে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে জরিমানা করা হবে। এ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। তাদের জরিমানা করা হবে। আগেও তাদের জরিমানা করা হয়েছে।
আমানতের নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণকে ব্যাংকিং পরিভাষায় ‘বিধিবদ্ধ তরল স্থিতি’ বলা হয়, যা এসএলআর নামে পরিচিত। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে ১৩ শতাংশ ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ৫ শতাংশ এসএলআর সংরক্ষণ করতে হয়। এসএলআর এর অর্থ ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজ ও বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকে।
এ তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে আটটি এএসএলআর সংরক্ষণ করতে না পারার কারণ তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছে। তবে পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. তালহার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করলেও সাড়া মেলেনি।
ব্যাংকটির ‘কমিউনিকেশন’ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকেও কোনো বক্তব্য আসেনি।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, এখন তো গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে। এ সমস্যা তো আগে আরো বেশি ছিল। আগের ঘটে যাওয়া সমস্যা তো রাতারাতি সমাধান করা যাবে না। তবে সময় দিলে আশা করা যাচ্ছে ঠিক করা যাবে।
এসএলআর সংরক্ষণ করতে না পারা নয়টির মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করেছে বিদেশি অডিট ফার্ম।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করে সমাধান করা হবে।
যদি কোনো ব্যাংক এসএলআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের জরিমানা দিতে হয়। জরিমানা সাধারণত প্রতিদিনের ভিত্তিতে ধার্য করা হয় এবং এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মাবলীর উপর নির্ভরশীল। জরিমানা সাধারণত অসংরক্ষিত পরিমাণের উপর একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হারে ধার্য করা হয়।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, এখন আমরা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছি। এসএলআর সংরক্ষণ হচ্ছে না তারল্য সংকটের কারণে। এজন্য জরিমানা দিতে হবে। জরিমানার অঙ্কটাও বেশি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এ সমস্যা তো আগেও ছিল। এটা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের আমানত বাড়ছে। আমানত বাড়তে থাকলে এ সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করি।
৫ অগাস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এ নয় ব্যাংকে নতুন বোর্ড করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এসব ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। অগাস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব ব্যাংকে সরাসরি তারল্য সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দেন।
কিন্তু পরে আন্তঃব্যাংক লেনদেন থেকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। এতেও সংকট না কাটলে শেষমেশ টাকা ছাপিয়েই ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ নুরুল আমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা। এ ব্যাংকে নানা অনিয়ম হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমানত আসছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম এক রাতের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। আমরা গ্রাহকের টাকা ফেরত দিচ্ছি। সবাই টাকা পাচ্ছেন। এসএলআরের সমস্যাও সমাধান হবে বলে আশা করছি।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবুর রহমান বলেন, আমানত ঠিকমত না পেলে এ ধরনের সমস্যা হয়। এ ব্যাংকে আগে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আর আমরা চাহিদা মোতাবেক টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে আমানতও তো আসতে হবে; সেই দিক দিয়ে নানা রকম ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সংকটে থাকা এসব ব্যাংকের মধ্যে কোন কোনটি জরিমানাও সঠিকভাবে দিতে পারে না।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী মনে করেন, “যেসব ব্যাংক এসএলআর সংরক্ষণ করতে পারছে না, সেসব তারল্য সংকটে রয়েছে। এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চললে ব্যাংকিং ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। কারণ গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করার মতো সক্ষমতা নেই বলেই বিবেচিত হয়।
সমস্যাজর্জিত ব্যাংকগুলোর উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি ব্যাংকগুলোকে নতুন আমানত সংগ্রহ, নতুন ঋণ বন্ধ করে দেওয়া এবং আগের ঋণের টাকা আদায়- এ তিন কাজে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন আরফান আলী।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।