সকল মেনু

আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক, ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ ইতিবাচক

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঢাকা সফররত প্রতিনিধিদল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে সংস্থার ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত হিসাবে জুড়ে দেওয়া পরামর্শগুলো বিশ্লেষণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

আইএমএফর দেয়া ৪৭টি শর্তের মধ্যে প্রায় ৪০টি শর্ত পূরণ কিংবা পূরণের পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এজন্য তারা আগের ৪৭০ কোটি (৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণের সঙ্গে নতুন করে চাওয়া ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার ঋণের বিষয়ে মোটামুটি ইতিবাচক।

মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, ডলার বাজার, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক লেনদেন (বিওপি) পদ্ধতি, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ ও জ্বালানি পণ্যের আমাদানিতে ভর্তুকি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এসব বিষয় ছাড়ও মোট ৪৭টি ইস্যু নিয়ে গতকাল ঢাকায় দফায় দফায় বৈঠক করেছে ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল।

দাতা সংস্থাটি হাতেগোনা কয়েকটি শর্ত ছাড়া প্রায় সবকিছুর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। কিন্তু ডলারের দর বেধে দেওয়া, রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি, কৌশলে খেলাপি ঋণ গোপন, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও রাজস্ব আদায় অনুোতে ঘাটতি (ট্যাক্স জিডিপি রেশিও) ও রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়ে প্রতিনিধি দল ব্যাপক আপত্তি তুলেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের পরামর্শে রিজার্ভ হিসাবায়নে বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল মেনে চলছে।

একই সঙ্গে ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ (এনআইআর) হিসাবে সংরক্ষণ করছে। কিন্তু ডলার বিক্রি বন্ধের প্রতিশ্রুতির পরেও আইএফটির চুক্তির কারণে সরাসরি ডলার না বেচে বিশেষ বিল পরিশোধে রিজার্ভ খয় হচ্ছে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিনিধি দল।

পাশাপাশি ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২০ টাকা বেধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি ডলারের দর বাজার ভিত্তিক ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তারা আপত্তিও জানিয়েছে। বাজারের ওপর ডলাররেট ছেড়ে দিতে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

পাশাপাশি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাবে গড়মিল তারা খতিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া সেপ্টেম্বরের জন্য ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ ১৪ দশমিক ৮৮বিলিয়ন সংরক্ষণের বিষয়ে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে সংস্থাটি।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইএমএফ জানিয়েছে যে, তাদের ৪৭ টি শর্তের মধ্যে প্রায় ৪০টি শর্ত পূরণ কিংবা পূরণের পথে রয়েছে। এজন্য তারা আগের ৪৭০ কোটি (৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণের সঙ্গে নতুন করে চাওয়া ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার ঋণের বিষয়ে মোটামুটি ইতিবাচক।

আর গভর্নর দেশে না থাকায় এবার আনুষ্ঠানিকভাবে রেপ-আপ বৈঠকে ঋণের কিছু জানানো হয়নি। তবে আগামী অক্টোবর মাসের ২২-২৪ অক্টাবরে যুক্তরাষ্ট্রে সংস্থাটির অনুষ্ঠিত বৈঠকে গভর্নরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে মিশন প্রতিনিধিদল। সেখানে ঋণের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষ হয়েছে। সেখানে তারা মূল্যস্ফীতি, ডলার বাজার, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক লেনদেন (বিওপি) পদ্ধতি, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, খেলাপি ছাড়া প্রায় সব বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। আর আমরা তো চেষ্টা করছি। তারা বিষয়টি উপলদ্ধিক করেছেন। তবে গভর্নর দেশে না থাকায় আনুষ্ঠানিক কোন সংবাদ সম্মেলন করা হয় নি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে মোট রিজার্ভের রেকর্ড ছিল ৪ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার, যা কমতে কমতে মাত্র ৩৪ মাসে এসে নেমেছে ২ হাজার ৪০০ কোটির ঘরে। আর ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি।

অপর একটি সূত্র জানায়, দেশের ব্যাংকগুলো আগ্রাসি ঋণ দেওয়ার পর কিছু ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। কিন্তু ঋণ আদায়ে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। খেলাপি কমাতে আইএমএফের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু খেলাপি না কমিয়ে দিনদিন বাড়ছে। গত জুন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ।

এদিকে অর্থঋণ আদালতে মামলায় আটকা খেলাপি ঋণ প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আবার অপলোপন (রাইট অফ) করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই দুই ধরণের খেলাপির তালিকা ব্যাংকের ব্যালেন্সশিটে দেখানো হয়না। অপরদিকে খেলাপি ঠেকাতে গত পাঁচ বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতপশিল করেছে ব্যাংকগুলো। তার মধ্যের একটা অংশ খেলাপি হয়েছে।

সবমিলে আইএমএফের হিসাবে খেলাপি ঋণ প্রায় পৌনে ৬ লাখ কোটি টাকা। আর দেশে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ কোটি টাকা। এটি বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৭ শতাংশ। অথচ আইএমএফ ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে আনতে শর্ত আরোপ করেছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top