সকল মেনু

ঋণের দায়ে এসএস স্টিলের জমি ও কারখানা নিলামে

২৯০ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ আদায়ে এসএস স্টিল লিমিটেডের। যার কারণে গত তিন মাসেই দুই দফায় এসএস স্টিলের সম্পদ নিলামের ঘোষণা হয়েছে। কোম্পানির সম্পদ নিলামে তুলছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)।

রাজধানীর প্রগতি সরণি শাখা থেকে ১২ এপ্রিল এ বিষয়ে একটি দৈনিক পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। ইউসিবির পক্ষ থেকে এসএস স্টিলের মালিকানায় থাকা নারায়ণগঞ্জে ১৩৫ একর ৭৯ শতক জমি, কারখানার ভবন ও যন্ত্রপাতি এবং চট্টগ্রামের ১৯৯ একর ১২ শতক জমি অবকাঠামোসহ নিলামের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

ইউসিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এসএস স্টিল জমি-অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। কোম্পানিটি সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বকেয়া আদায়ের জন্য ঋণচুক্তি অনুযায়ী বন্ধকী জমি নিলামে তোলা হচ্ছে।

২০২০ সালের আগস্টে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সালেহ স্টিলের ৯৯ শতাংশ শেয়ার কেনে এসএস স্টিল। ২০২২ সালের এপ্রিলে আল-ফালাহ স্টিল ও রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের ৯৯ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় ৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকায়। এরপর আল-ফালাহ স্টিলে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল এসএস স্টিল।

বড় বিনিয়োগের জেরে এসএস স্টিলের বার্ষিক এমএস রড উৎপাদন ক্ষমতা চান লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টনে পৌঁছায়। কিন্তু সক্ষমতা বাড়লেও বিনিয়োগ করতে গিয়ে ঋণে জড়িয়ে পড়ে এসএস স্টিল। আর ঋণের বোঝা টানতে গিয়েই বিপাকে পড়ে।

যদিও এসএস স্টিল কর্তৃপক্ষ ঋণের বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি নয়, বরং কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। জানতে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ঋণের বিষয়ে এখন চিঠি পাননি বলে জানান। তবে ‘খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে নানা বিতর্ক, প্লেসমেন্ট শেয়ার জালিয়াতির চেষ্টা ও রহস্যজনক কারণে ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া কোম্পানিটি বারবার নিলামের মুখে পড়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। এর জের ধরে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কোম্পানিটির শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে। সর্বশেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এসএস স্টিলের প্রতিটি শেয়ার ছয় টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৬৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বকেয়া ঋণ আদায়ে এসএস স্টিলের সম্পদ নিলামে তোলার ঘোষণা দিয়েছিল ব্যাংক এশিয়া। গত ১২ জানুয়ারি দৈনিক পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল ব্যাংক এশিয়া।

গাজীপুরের ১৪৮ একর পাঁচ শতক জমি, কারখানা ভবন ও কারখানার যন্ত্রপাতিসহ এসএস স্টিলের মালিকানাধীন সবকিছু নিলামে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলো ব্যাংক এশিয়া। পরে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে যাত্রায় নিলাম ঠেকিয়েছে বিগত সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধা নেয়া ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন এসএস স্টিল।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন এসএস স্টিলের উদ্যোক্তা জাভেদ অফগ্যানহাফেন। কিন্তু ঋণ নিলেও সেই ঋণ পরিশোধ করেননি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে থাকা এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি কোনো ব্যাংক। ২০২৪ সালে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ঋণ আদায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যাংকগুলো, যে কারণে ব্যাংক এশিয়ার পর এবার আলোচনায় ইউসিবির নিলাম বিজ্ঞপ্তি।

পুঁজিবাজারের একটি বিতর্কিত নাম জাভেদ অপগ্যানহাফেন, যিনি দুর্বল কোম্পানিকে বিশেষ কায়দায় সবল দেখিয়ে পুঁজিবাজার থেকে হাতিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভু্ক্তির মাধ্যমে ব্যবসার নামে নিয়েছেন বিপুল ব্যাংক ঋণ।

ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটিতে। এদিকে তার নেতৃত্বাধীন কোম্পানিগুলো একের পর এক সংকটের মুখে। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটির শেয়ারদর নেমেছে সাড়ে ৩ টাকায়, আরেকটির ৮ টাকায়।

কোম্পানিগুলোর যখন এমন রুগণ দশা, সে সময় তিনি ২৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্রান্সের প্যারিসে করেছেন নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান।

জাভেদ অপগ্যানহাফেন দুর্বল কোম্পানির সবল কারবারি হিসেবেই পুঁজিবাজারে পরিচিত। তিনি মূলত দুর্বল কোম্পানিকে অতিরঞ্জিত করে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসেন। সেসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই রুগণ হয়ে ওঠে, যার উদাহরণ হচ্ছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, এসএস স্টিল এবং ফু ওয়াং সিরামিকস। এই তিনটি কোম্পানির নেতৃত্বে রয়েছেন জাভেদ।

আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসএস স্টিলের ঋণের বোঝা ‘নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি’র তথ্য মিলেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির মোট ব্যাংকঋণ দুই হাজার কোটি কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ৫৩৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা স্বল্পমেয়াদি ঋণের তথ্য দিয়েছে কোম্পানিটি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের বোঝা বেড়ে ৮৫৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সর্বশেষ এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে এক হাজার ২৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এসএস স্টিলকে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউসিবি, এবি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া। প্রতিশ্রুত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করে অর্থঋণ আদালতের অনুমতির পর সম্পদ নিলামের উদ্যোগ নিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসএস স্টিলের ক্রমবর্ধমান দায়ের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের সঙ্গে সখ্যের কারণে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিএসইসি। উল্টো জাভেদ অফগ্যানহাফেনকে বিভিন্ন অনৈতিক সুযোগ দিয়েছে বিএসইসি।

তথ্যমতে, ২০১৮ সালে আইপিওর মাধ্যমে দুই কোটি ৫০ লাখ শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেএসএস স্টিল। তালিকাভুক্তির পর আয়-মুনাফা বৃদ্ধির কথা বলেই পুঁজিবাজারে আসে কোম্পানিটি। কিন্তু তালিকাভুক্তির ছয় বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা বাড়েনি, উল্টো কমেছে।

আইপিও প্রসপেক্টাসে ২০১৭ সালে ২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা দেখিয়েছে কোম্পানিটি। ২০২৪ সাল শেষে এই মুনাফা পাঁচ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ সাত বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। বড় বিনিয়োগের কারণে ঋণ নিয়ে সেই বোঝা টানতে গিয়ে মুনাফা কমেছে বলে দাবি করেছে এসএস স্টিল।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top