সকল মেনু

ঋণে হাবুডুবু আইসিবি, তারল্য বাড়াতে নিচ্ছে আরো ঋণ

শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট কমাতে ও শুদ্ধাচার ফেরাতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। দফায় দফায় সরকারের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছে। প্রথমত তারল্য বাড়াতে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে লক্ষেই নতুন করে আরো ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাচ্ছে রাষ্ট্রায়াত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার দরজা খুলেছে। তবে আইসিবি আগেই প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মেয়াদি আমানত নিয়েছে। এর মধ্যে আট হাজার কোটি টাকার মতোই হচ্ছে উচ্চ সুদের আমানত। নতুন করে আরো ৩ হাজার কোটি টাকার স্বল্প মেয়াদী ঋণ নিতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক রেট বর্তমানে ৪ শতাংশ। এ সুদেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ চায় আইসিবি। তবে সংস্থাটি দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ পাবে না। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারই আছে দেড় বছর অর্থাৎ ১ বছর ৬ মাসের জন্য ঋণ দেওয়ার। প্রশ্ন উঠেছে, আইসিবি দেড় বছরের মধ্যে ঋণ ফেরত দিতে পারবে কি- আর না পারলে কী হবে?

অন্তর্বতী সরকারের আমলে আগস্ট মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রায়াত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি। অবশেষে তা তিন হাজার কোটিতে দাঁড়ায়। আইসিবিকে ঋণ দিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) অর্থ বিভাগে সুপারিশ পাঠিয়েছে। শিগগিরই এই অর্থের ছাড় দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আইসিবি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আইসিবি প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মেয়াদি আমানত নিয়েছে। এর মধ্যে আট হাজার কোটি টাকার মতোই হচ্ছে উচ্চ সুদের আমানত। এ জন্য সংস্থাটিকে বছরে ৬০০ কোটি টাকার বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।

এদিকে আইসিবির কিছু ভুল বিনিয়োগও রয়েছে। যার পরিমাণ হাজার কোটি টাকার মতো। এ বিনিয়োগের বেশির ভাগই পদ্মা ব্যাংকসহ কিছু দুর্বল ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। মেয়াদ শেষ হলেও আইসিবি এসব বিনিয়োগ ফেরত পাচ্ছে না। শুধু মূল টাকা নয়, সুদও ফেরত পাচ্ছে না সংস্থাটি।

তবে এই ঋণের গ্যারান্টার হচ্ছে সরকার। সভরেন (রাষ্ট্রীয়) গ্যারান্টি অনুমোদন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা ও আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

বিনিয়োগ সম্পর্কে আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, আইসিবির ঋণের টাকা সম্পূর্ণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হবে না। ঋণের কিছু অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং একটি অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় করা হবে। তবে এই ঋণের অর্থ ব্যবহারে একটি গাইডলাইন থাকবে, যা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে।

আবু আহমেদ বলেন, ঋণ দিতে অর্থ উপদেষ্টা সহযোগিতা করছেন। আশা করছি, বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই অর্থ ছাড় দেবে। এই ঋণ পেলে আইসিবির বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে। ঋণের কিছু টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং কিছু অর্থ সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে।

ইতোমধ্যে ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে তার একটি খসড়া পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে কতটা বিনিয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে বলেন তিনি।

আবু আহমেদ আরও বলেন, আইসিবির কিছু উচ্চ সুদের ঋণ আছে। তাতে সুদ বাবদ বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণের অর্থ পাওয়া গেলে এই ঋণের একটি অংশ ফেরত দেওয়া হবে।

পুঁজিবাজারে তারল্য ফেরাতে সরকারের দেয়া ঋণ সম্পর্কে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, আইসিবির জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের সভরেন গ্যারান্টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার দরজা খুলেছে।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হচ্ছে জনগণের। জনস্বার্থ থাকলেই সংস্থাটি তা দিতে পারে। তবে উচ্চ সুদের আমানত পরিশোধ একটা যৌক্তিক কারণ বটে। সামস্টিক অর্থনীতির যে অবস্থা, ঋণ পেলেও দেড় বছরের মধ্যে কি আইসিবি ফেরত দিতে পারবে? না পারলে কী হবে, তা শর্তের মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, এভাবে ঋণ নিয়ে সাময়িক দম দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে বাজারের খুব বেশি উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। বাজারের উন্নতির চিন্তা করতে হবে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। আইসিবিকে আগের ভুল বিনিয়োগের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ পেতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি চেয়ে আইসিবি চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর চিঠি দিয়েছিল। এরপর ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক, শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং আইসিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকায় ওই বৈঠক থেকে অর্থ বিভাগকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারের গ্যারান্টি সাপেক্ষে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি নেই।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top